যুদ্ধবিরতি চুক্তি লংঘন করে ফিলিস্তিনের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরদের হত্যার প্রতিবাদে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীসহ দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেইটে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল যুদ্ধবিরতি চুক্তি লংঘন করে ফিলিস্তিনের বেসামরিক লোকজনের উপর গণহত্যার দায়ে নেতানিয়াহুকে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করে ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া রক্তখেকো, রক্তচোষা নেতানিয়াহু মানব সভ্যতার দুশমন।
গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে ইসরাইলের বর্বরোচিত হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে নেতানিয়াহুর বিচারের দাবি তুলতে আহ্বান জানান।
পাসপোর্টে ইসরাইল গমনের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করার দাবি জানিয়ে মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, বাংলাদেশের পাসপোর্টে ইসরাইল গমন নিষেধ ছিল। সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইলের দোসর শেখ হাসিনা গোপনে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে ইসরাইল যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ইসরাইলের সাথে সব ধরণের কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে তিনি বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, মুসলিমদের টাকায় ইসরাইল অস্ত্র তৈরি করে সেই অস্ত্র দিয়ে আমাদের মুসলিম ভাই-বোনদের হত্যা করবে তা মেনে নেওয়া যায় না, যাবে না। ইসরাইলের উপর অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির দাবিও জানান জামায়াতের এই নেতা।
প্রতিবাদ সভায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মাওলানা ড. খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, ইসরাইল ভিক্ষুকরূপে আরব বুকে একটু ভূখ- চেয়েছে। তাদেরকে ভূখ- দেওয়ার পর তারা মুসলমানদের প্রথম কাবা দখল করে নেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। এজন্যই তারা ফিলিস্তিনের নাগরিকদের উপর বর্বরোচিত হামলা চালাচ্ছে। ইসরাইলের এই হামলা নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বিশ্ব নেতাদের মানবাধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, সন্ত্রাসী ইসরাইল মুসলমানদের প্রথম কিবলা ধ্বংস করার লক্ষ্যে ফিলিস্তিনের বেসামরিক লোকজনের উপর হামলা চালিয়ে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরকে হত্যা করেছে। ইসরাইল পরিচালিত গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি ইসরাইলের পণ্য বর্জন করতে মুসলিম উম্মাহর প্রতি আহ্বান জানান।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ইসরাইলের মতোই বাংলাদেশের জনগণের উপর আওয়ামী লীগ গণহত্যা চালিয়েছে। পার্থক্যটা হচ্ছে, ইসরাইল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের উপর গণহত্যা চালাচ্ছে, আর বাংলাদেশের জনগণের উপর নিজ দেশে আওয়ামী লীগ গণহত্যা চালিয়েছে। তিনি নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্যে বলেন, নেতানিয়াহু হামলা চালিয়ে ঘোষণা দিয়েছে, হামলা মাত্র শুরু, আমরা বলবো তোমাদের ধ্বংসের যাত্রা শুরু। মক্কা বিজয়ের মতই অচিরেই ফিলিস্তিন বিজয় লাভ করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাফেররাও যুদ্ধবিরতি চুক্তি লংঘন করে মক্কায় হামলা চালিয়েছে, ইসরাইলও যুদ্ধবিরতি চুক্তি লংঘন করে ফিলিস্তিনে হামলা চালিয়েছে।
সভায় আরো বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি যথাক্রমে মোহাম্মদ কামাল হোসাইন, অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান, শামছুর রহমান, ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণের কর্মপরিষদের সদস্য অধ্যাপক মোকাররম হোসাইন খান প্রমুখ। প্রতিবাদ সভা শেষে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেইট থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে মৎস্য ভবন অতিক্রম করে শাহবাগ গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ ছাড়াও হাজার-হাজার তৌহিদী জনতা অংশগ্রহণ করেন।
বাড্ডায় জামায়াতে বিক্ষোভ-সমাবেশ: সন্ত্রাসী, দখলদার ও জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল কর্তৃক গাজায় নির্মম ও নিষ্ঠুর গণহত্যার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ, আবরলীগ, ওআইসি ও কমনওয়েলথ সহ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানিয়ছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম।
গতকাল দুপুর ২টায় রাজধানীর বাড্ডায় উত্তর বাড্ডা কামিল মাদরাসার সামনের সড়কে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের নিশংস ও নির্মম গণহত্যা এবং বর্বোরোচিত হামলার প্রতিবাদে এবং অবিলম্বে হামলা বন্ধের দাবিতে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত এক বিক্ষোভ পূর্ব সমাবেশে এসব কথা বলেন। কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে এতে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারি সেক্রেটারি নাজিমুদ্দিন মোল্লা, ডা. ফখরুদ্দিন মানিক ও ইয়াসিন আরাফাত, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মুহিব্বুল্লাহ, জামাল উদ্দিন, প্রচার-মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার, নাসির উদ্দীন, মহানগরী পশ্চিম শিবির সভাপতি সালাহ উদ্দিন প্রমুখ। বিশাল মিছিল উত্তর বাড্ডা কামিল মাদ্রাসার সামনে থেকে শুরু হয়ে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে রামপুরা ব্রিজে এসে পথসভার মাধ্যমে শেষ হয়।
ড. রেজাউল করিম বলেন, পবিত্র মাহে রমযানে জায়নবাদী, সন্ত্রাসী অবৈধ রাষ্ট্র শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে গাজায় হামলা ও নির্মম গণহত্যা চালিয়ে বিশ্বের সাড়ে ৭শ কোটি মানুষের কলিজায় আঘাত করেছে। এ হামলায় মাধ্যমে তারা শুধু শান্তিচুক্তি ভঙ্গই করেনি বরং যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু এসব করে দখলদার আগ্রাসী বাহিনীর শেষ রক্ষা হবে না বরং অচিরেই ইসলাম ও মুসলমানদের চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত হবে। তিনি অতীতের ইতিহাস টেনে বলেন, ইতিহাস সাক্ষী মুসলমানরা কখনো পরাচিত হয়নি বরং পবিত্র মাহে রমযানে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে সীমিত সামর্থ্য ও জনবল নিয়ে বিশাল কাফির বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছে। তাই জায়নবাদী নির্মমতায় মুসলিম উম্মাহর বিচলিত হওয়ার কোন কারণ নেই বরং চূড়ান্ত বিজয় গাজা ও ফিলিস্তিনবাসীর জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি ইসরাইলী বর্বরতার বিরুদ্ধে বিশ্বের শান্তিপ্রিয় ও আত্মসচেতন মানুষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। অন্যথায় জায়নবাদীরা গোটা বিশ^কেই অস্থির করে তুলবে।
তিনি বলেন, গত প্রায় ১৬ বছর পতিত আওয়ামী বাকশালী ও ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশে অপশাসন, দুঃশাসন ও নির্মম গণহত্যা চালিয়েছে। তারা ইসরাইল থেকে অস্ত্র আমদানি করে জামায়াত-শিবির সহ বিরোধী দলের ওপর ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছে। কথিত বিচারের নামে প্রহসন করে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, আব্দুল কাদের মোল্লা, শহীদ মোহাম্মদ কামারুজ্জান ও শহীদ মীর কাসেম আলী সহ জাতীয় নেতাদের শুধু হত্যা করা হয়নি বরং অন্য শীর্ষনেতৃত্বকেও তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা ও বিচারকরা পালিয়ে গেলেও আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম এখনো কারাগারে অবরুদ্ধ রয়েছেন। তিনি টালবাহানা পরিহার করে অবিলম্বে এটিএম আজহার সহ আলেম-উলামাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
মহানগরী উত্তর সেক্রেটারি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হয়নি। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে এখনো পতিত স্বৈরাচারের প্রতিভূরা সক্রিয় রয়েছে। তাই দেশকে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের প্রভাবমুক্ত করতে সবার আগে ফ্যাসিবাদী ও তাদের দোসরদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। খুনীদেরকে কোনভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না। আর প্রয়োজনীয় সংস্কারের পরই হতে হবে নির্বাচন। সংস্কার, বিচার ও আগে স্থানীয় নির্বাচন ছাড়া জনগণ কোন জাতীয় নির্বাচন মেনে নেবে না। যারা সংস্কার ছাড়াই নির্বাচন চাচ্ছেন তারা জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তিনি আগামী নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক করতে সরকারকে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার আনার আহবান জানান। অন্যথায় আমাদের সকল অর্জনই ব্যর্থ হবে।
নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল: ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনে বর্বরোচিত, নির্মম গণহত্যা বন্ধের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে এই বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
মিছিলটি শহরের ডিআইটি মসজিদের সামনে থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা আবদুল জব্বারের সভাপতিত্বে এসময় উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমীর আব্দুল কাইউম, সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসাইন, সহকারী সেক্রেটারি জামাল হোসাইন, এইচ এম নাসির উদ্দিন, মোখলেসুর রহমান, মাওলানা ওমর ফারুক, ও প্রচারক সম্পাদক হাফেজ আব্দুল মোমিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবদুল জব্বার বলেন- একজন মুসলমান হিসেবে আমরা অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ অত্যন্ত শোকাহত। এই সময়ে ইসরাইল বাহিনী ফিলিস্তিনের সাথে যুদ্ধ বিরতি চুক্তি ভঙ্গ করে শত শত নারী-পুরুষ-শিশুকে নির্বিচারে হত্যা করছে। এহেন অন্যায় আচরণে আমরা ঘরে বসে থাকতে পারি না। সেজন্য আমরা নারায়ণগঞ্জে শোকাহত হয়ে ইসরাইল বাহিনীর নির্মম বর্বর হত্যাকা-ের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আজ জাতিসংঘ আমেরিকা কোথায়? তারা মানবতার কথা বলে অথচ তাদের ইন্ধনে ইসরাইল বাহিনী ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে।