# কামালের মৃত্যুদণ্ড । রাজসাক্ষী হওয়ায় মামুনের ৫ বছরের কারাদণ্ড
# ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য দিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যার প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে ব্যর্থতার জন্য শেখ হাসিনাকে দেওয়া হয়েছে আমৃত্যু কারাদণ্ড।
# হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করে নির্মূলের নির্দেশ’, চাঁনখারপুলে ছয় হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।
# চাঁনখারপুলে ছয় হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড ও আবদুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড
# হাসিনার বিরুদ্ধে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি প্রমাণিত হয়েছে, তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, প্রতিরোধ করেননি -ট্রাইব্যুনাল
মিয়া হোসেন: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সন্দেহাতীতভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় নিজের তৈরি করা ট্রাইব্যুনাল থেকেই মৃত্যুদণ্ডের রায় পেলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সাথে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তাদের দু’জনের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। রাজস্বাক্ষী হয়ে জ্ঞাত সকল অপরাধের স্বীকারোক্তি দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করায় সাবেক আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেনÑবিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম রায় এটি। আর আগে শেখ হাসিনা স্যোশাল মিডিয়ায় আদালত নিয়ে মন্তব্য করায় আদালত অবমাননার অভিযোগ ৬ মাসের সাজা দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় আদালতে উঠে মামলা পরিচালনা সংশ্লিষ্ট তদন্তসংস্থা, প্রসিকিউশন, আইনজীবী, সাংবাদিক ও আইনশৃংখলা বাহিনীর সকল সদস্যকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। পরে ১২টা ৪৫ মিনিটের দিকে ট্রাইব্যুনাল রায় পড়া শুরু করেন। ছয়টি অধ্যায়ে ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায় পড়া শেষ হয় প্রায় আড়াই ঘণ্টায়।
ট্রাইব্যুনালের দুই সদস্য রায়ের দুটি অংশ পড়ে শোনান। সবশেষে আসামীদের সাজার বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার। গোটা ট্রাইব্যুনাল বেলা ১১টার আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। আইনজীবীদের পাশাপাশি শহীদ পরিবার, আহত জুলাই যোদ্ধা ও সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন। পুরো রায় প্রচারকালীন সময়ে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। আদালতের বাইরেও ছিল উৎসুক জনতার ভিড়। রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে উল্লাস প্রকাশ করা হয়। গতকাল ১৭ নভেম্বর ছিল শেখ হাসিনার বিয়ে বার্ষিকী। এ দিনেই তার মৃত্যুদ-ের রায় প্রকাশ হলো।
রায়ে আদালত বলেছেন, এ মামলায় ৫৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এটি ছোট সংখ্যা নয়। ঘটনার বিভিন্ন ভিডিও পেন ড্রাইভে দাখিল করা হয়েছে এবং ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করা হয়েছে। বিভিন্নজনের সাথে শেখ হাসিনার কথোপকথনের অডিও এভিডেন্স হিসেবে দাখিল করা হয়েছে। এসব অডিও ফরেনসিক পরীক্ষায় সঠিক পাওয়া গেছে। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিবেদন, পত্রিকার নিউজসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট প্রসিকিউশনের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। সাক্ষীদের জবানবন্দী ও জেরা, যুক্তিতর্ক এবং যাবতীয় এভিডেন্স পর্যালোচনা করেছে ট্রাইব্যুনাল।
চূড়ান্ত রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, হাত-পা, নাক-চোখ ও মাথার খুলি হারানো যেসব সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের বাস্তব অবস্থা দেখলে যে-কোনো মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক মানসিক অবস্থা ধরে রাখা কঠিন। ফলে এ অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের যে-কোনো মূল্যে বিচারের আওতায় আনা উচিত। এক্ষেত্রে ন্যায়বিচারকে ব্যাহত হতে দেওয়ার সুযোগ নেই।
ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি প্রমাণিত হয়েছে। তিনি (হাসিনা) নির্দেশ দিয়েছেন এবং প্রতিরোধ করেননি।
প্রথম অভিযোগে শেখ হাসিনাকে সাজা দেয়ার ব্যাখ্যায় ট্রাইব্যুনাল বলেন, সংঘটিত অপরাধে প্ররোচনা-উসকানি, আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ এবং সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয়তা ও অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়ী। এসব অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলো।
দুই নম্বর অভিযোগের অপরাধ বর্ণনা করে ট্রাইব্যুনাল বলেন, এই অভিযোগে দুটি অপরাধের জন্য শেখ হাসিনাকে দায়ী করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি অপরাধ হলো জুলাই গণআন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ। এই নির্দেশনা দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এ ৩(২)(ছ) (জ) ও ৪(১) (২) (৩) ধারার অপরাধ সংঘটন করেছেন। দ্বিতীয় অপরাধটি হলো শেখ হাসিনার এই নির্দেশ মেনে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলী করে হত্যা ও একই দিনে সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়া। এসব অপরাধের দায়ে আদালতের সিদ্ধান্ত তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
ট্রাইব্যুনাল বলেন, একই অপরাধসহ আসামী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামনু সমানভাবে দায়ী। এর জন্য কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। মামুনেরও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্য। কিন্তু রাজসাক্ষী হয়ে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিষয়ে সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ করে তিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে মনে করে ট্রাইব্যুনাল। সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশে তার এই সাক্ষ্য বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করেছে। ফলে তাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে নমনীয়তা প্রদর্শন করছে আদালত। সবকিছু বিবেচনায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো।
১৮ জুলাই সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশের কথোপকথনে প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ সময় ট্রাইব্যুনাল-১ বলেন, ‘মাকসুদ কামাল, হাসানুল হক ইনু ও তাপসসহ বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন ছিল সঠিক, এআই জেনারেটেড নয়। ১৮ জুলাই সাবেক মেয়র তাপসের সঙ্গে শেখ হাসিনার মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনার কথোপকথনে প্রমাণিত হয়েছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের রাজাকারের নাতিপুতি বলে উসকানি দিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনে নিরীহ মানুষের ওপর বিস্তৃত পরিসরে ও পদ্ধতিগতভাবে হামলার নির্দেশ দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন।
আসামীদের মধ্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে এই মামলায় পলাতক হিসেবে বিচার করা হয়েছে। তাদের দুজনেই অবস্থান করছেন ভারতে। সাবেক আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুন এই মামলার একমাত্র গ্রেফতারকৃত আসামী। তিনি এই মামলায় অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন। তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
কোন অপরাধে কী সাজা
জুলাই আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট ৫ অভিযোগ আনা হয়েছিল এ মামলার আসামীদের বিরুদ্ধে।
এর মধ্যে প্রথম অভিযোগে ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য দিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যার প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে ব্যর্থতার জন্য শেখ হাসিনাকে দেওয়া হয়েছে আমৃত্যু কারাদণ্ড।
দ্বিতীয় অভিযোগে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করে নির্মূলের নির্দেশ’, চতুর্থ অভিযোগে চাঁনখারপুলে ছয় হত্যা এবং পঞ্চম অভিযোগে আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনাতেও শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। এই তিন অভিযোগ মিলিয়ে তাকে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড।
চতুর্থ অভিযোগে চাঁনখারপুলে ছয় হত্যা এবং পঞ্চম অভিযোগে আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দোষী সাব্যস্ত করেছে ট্রাইব্যুনাল।
তাদের মধ্যে কামালকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। আর মামুন রাজসাক্ষী হিসেবে তথ্য দিয়ে অপরাধ প্রমাণে সহযোগিতা করায় তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ডের লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে তাদের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার আসামীদের সাজা ঘোষণা করে বলেন, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ২০ (৩) ধারা অনুযায়ী, প্রচলিত রেওয়াজ মাফিক কার্যকর করা হবে।
বাংলাদেশের রেওয়াজ অনুযায়ী, বেসামরিক আদালতের রায়ে আসামীকে আমৃত্যু ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামীরা আপিল করারও সুযোগ পাবেন। তবে হাসিনা ও কামাল পলাতক থাকায় আপিল করতে চাইলে তাদের ট্রাইব্যুনাল আত্মসমর্পণ করে এক মাসের মধ্যে আপিল করতে হবে।
পাঁচ অভিযোগে যা ছিল
চলতি বছরের ১২ মে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এরপর ১ জুন প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের দপ্তরে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এবং যাবতীয় দলিল জমা দেয়।
পরে প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাড়ে আট হাজার পৃষ্ঠার ওই অভিযোগপত্র বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন। এ তিনজনের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। ওইদিন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ হয়।
গত ১০ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচ অভিযোগে শেখ হাসিনা, কামাল ও মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-১। সেই সঙ্গে মামুনের রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
অভিযোগ-১: গণভবনে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য প্রদান এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ তৎকালীন সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ‘প্ররোচনা, সহায়তা ও সম্পৃক্ততায়’ তাদের অধীনস্ত ও নিয়ন্ত্রণাধীন আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য ও সশস্ত্র ‘আওয়ামী সন্ত্রাসীদের’ মাধ্যমে ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার উপর আক্রমণের অংশ হিসেবে হত্যা, হত্যার চেষ্টা, নির্যাতন এবং অন্যান্য অমানবিক আচরণ করার অপরাধ সংঘটনের প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে ব্যর্থতা, অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শান্তি প্রদান না করা এবং ষড়যন্ত্র করার অপরাধ; যা আসামীদের জ্ঞাতসারে সংঘটিত।
অভিযোগ-২: আসামী শেখ হাসিনার ছাত্র-জনতার উপর হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করে নির্মূলের নির্দেশ’ এবং এ নির্দেশ বাস্তবায়নে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ও অধীনস্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ প্রদানের পাশাপাশি সহায়তা, সম্পৃক্ততা ও ষড়যন্ত্র করেন।
অভিযোগ-৩: রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে স্বল্প দূরত্ব থেকে নিরস্ত্র আন্দোলনকারী ছাত্র আবু সাঈদের ‘বুক লক্ষ্য করে বিনা উসকানিতে একাধিক গুলী চালিয়ে’ তাকে নির্মমভাবে হত্যা করার মাধ্যমে উল্লিখিত আসামীদের জ্ঞাতসারে এবং তাদের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ, প্ররোচণা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা এবং ষড়যন্ত্র করার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন।
অভিযোগ-৪: ঢাকা মহানগরীর চাঁনখারপুল এলাকায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর তৎকালীন সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে নিরীহ-নিরস্ত্র ৬ জন ছাত্র-জনতাকে গুলী করে হত্যা করার মাধ্যমে উল্লিখিত আসামীদের জ্ঞাতসারে এবং তাদের কর্তৃক হত্যার নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা এবং ষড়যন্ত্র করার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন।
অভিযোগ-৫: ঢাকার আশুলিয়া থানার সামনে এবং আশপাশ এলাকায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার উপর তৎকালীন সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরীহ-নিরস্ত্র ৬ ছাত্র-জনতাকে গুলী করে তাদের মধ্যে ৫ জনের মৃতদেহ এবং একজনকে জীবিত ও গুরুতর আহত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার অপরাধ, যা আসামীদের জ্ঞাতসারে সংঘটিত হয়েছে। ওই ঘটনায় হত্যা, নির্যাতন, মৃত ও জীবিত অবস্থায় আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে অমানবিক আচরণ করার অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে আসামীদের বিরুদ্ধে।
গত ৩ আগস্ট প্রসিকিউশন প্রারম্ভিক বিবৃতি (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) দেয় এবং ৪ আগস্ট মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় ট্রাইব্যুনাল থেকে।
সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক শেষে ২৩ অক্টোবর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়। এরপর ১৩ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল জানায়, এ মামলার রায় হবে ১৭ নভেম্বর।
মামলায় প্রসিকিউশন ৮১ জন সাক্ষীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগ, আলামত হিসাবে ৬৯টি অডিও ক্লিপ, ৩টি মোবাইল নম্বরের সিডিআর এবং ১৭টি ভিডিও ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করা হয়। মামলার বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হয় ১০৫ দিনে।
প্রসিকিউশনের প্রধান কৌঁসুলি হিসেবে এ মামলা পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, বিএম সুলতান মাহমুদ, ফারুক আহম্মদ, মো. আব্দুস সোবহান তরফদার, মো. সহিদুল ইসলাম সরদার, তানভীর হাসান জোহাসহ প্রসিকিউশন দল। চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন যায়েদ বিন আমজাদ। আর শেখ হাসিনা ও কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন শুনানি করেন। গতকাল তারা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। সেই সাথে এটর্নী জেনারেল আসাদুজ্জামানও উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিক্রিয়া
ঢাকায় এ রায় হওয়ার পরপরই ভারত থেকে বিবৃতি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ফেরারি আসামী শেখ হাসিনা। তার সেই বিবৃতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো প্রকাশ করেছে। এ রায়কে ‘পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিয়ে হাসিনা সেখানে বলেছেন, “আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘৃণ্য আদেশের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের চরমপন্থি ব্যক্তিরা আমাকে হত্যার যে মনোভাব প্রকাশ করছে-বাংলাদেশের সর্বশেষ নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া এবং আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করার লক্ষ্যই সেখানে স্পষ্ট।”
অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবার ও আহতরা ঢাকায় ট্রাইব্যুনালের সামনে এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। 'এই মাত্র খবর এল, খুনি হাসিনার ফাঁসি হল' স্লোগান দিতে দিতে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমরা মনে করি এই রায়টি কনো ধরনের কোনো অতীতের প্রতিশোধ নয়। এটি হচ্ছে জাতির প্রতিজ্ঞা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। এটা হচ্ছে জাতির কোয়েস্ট ফর জাস্টিস।
‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ড’ মেনে এ বিচারের রায় হয়েছে দাবি করে তাজুল বলেন, “আমরা এটাও একই সাথে বলতে চাই, যে কোয়ালিটি অফ এভিডেন্স এখানে দেখানো হয়েছে, যে ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ এই আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে, বিশ্বের যে কোনো আদালতের স্ট্যান্ডার্ডে এই সাক্ষ্যপ্রমাণগুলো উত্তীর্ণ হয়ে যাবে। পৃথিবীর যেকোনো আদালতে এই সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে আজকে যেসব আসামীকে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে তারা প্রত্যেকেই সেই শাস্তি পাবেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমরা মনে করি, শহীদদের প্রতি, দেশের প্রতি, এদেশের মানুষের প্রতি, গণতন্ত্রের প্রতি সংবিধানের প্রতি, আইনের শাসনের প্রতি আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা পরিশোধের স্বার্থে এ রায় একটি যুগান্তকারী রায়। এ রায় প্রশান্তি আনবে, ভবিষ্যতের প্রতি একটা বার্তা, বাংলাদেশের ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের প্রতি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সরকার নিয়োজিত হাসিনার জন্য নিয়োজিত আইনমন্ত্রী আমির হোসেন বলেন, রায়টা আমার পক্ষে হয়নি, বিপক্ষে গেছে। এজন্য আমি ক্ষুদ্ধ। কষ্ট লালন করতেছি। আসামীদের ফাঁসির রায়ে আমি কষ্ট পেয়েছি।
সাক্ষীরা কে কী বলেছিলেন
এ মামলায় মোট ৫৪ জন সাক্ষ্য দেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীক আবু সাঈদের বাবা, নিহতদের পরিবারের সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম, জুলাই আন্দোলনের আরেক নেতা উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।
বদরুদ্দিন উমরের লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনানো হয় ট্রাইব্যুনালে, যা তিনি মৃত্যুর আগে লিখে পাঠিয়েছিলেন। এ ছাড়া রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
তিনি বলেন, ১৮ জুলাই ২০২৪‑এ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে ফোন করে জানায় যে, শেখ হাসিনা আন্দোলন বন্ধ করার জন্য প্রত্যক্ষভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।
হেলিকপ্টারে করে হামলার বিষয়ে মামুন বলেন, প্রতিবাদকারীদের এলাকা ভাগ করা হয়েছিল। তারপর হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ছাত্র ও সাধারণ বেসামরিক অনেককে হত্যা ও জখম করা হয়।
এই মামলার ৪ নম্বর অভিযোগ হল রাজধানীর চানখাঁরপুলে ৬ হত্যা। এ মামলায় ১৬ অক্টোবর সাক্ষ্য দেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, যিনি আন্দোলনের সামনের সারির ছাত্রনেতা ছিলেন।
১৪০০ জনকে হত্যার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এখন আমরা বিভিন্নভাবে তালিকা পাচ্ছি। এর আগে আমরা আরও দুটি হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছি, যেটা বিডিআর বিডিআর হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তীতে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড। শত শত মানুষকে গুম করে হত্যা করা হয়েছে। অনেককে আর ফিরে পাওয়া যায় নাই। আমরা আয়নাঘর প্রত্যক্ষ করেছি। সুতরাং প্রত্যেকটা ঘটনায় প্রত্যেকটা ভিক্টিমের জন্য যদি আপনি একবার করে বিচার করতে যান, তাহলে এই বিচার হয়ত কেয়ামত পর্যন্ত শেষ হবে না। আমরা এ সকল ভিক্টিমদের পক্ষ থেকে এই ‘মিসডিডগুলো’ যে শেখ হাসিনা এবং এর সাথে আর যারা জড়িত ছিলেন, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছি এবং আশা করি এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হবে।
মাহমুদুর রহমান সাক্ষ্যে বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডে শেখ তাপসের জড়িত থাকার সব রকম প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাকে কখনও বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দেশপ্রেমিক ৫৭ জন অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তাদের পরিবারের উপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তৎকালীন সরকার প্রধান, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, স্বরাষ্টমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ সেনাসদস্য এবং তাদের পরিবারকে রক্ষা করবার কোনো রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, বরং দুই দিন ধরে এই হত্যাযজ্ঞ ঘটতে দিয়েছিল।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম সাক্ষ্যে বলেন, ছাত্রদেরকে রাজাকারের বাচ্চা এবং রাজাকারের নাতিপুতি আখ্যায়িত করায় সমগ্র দেশের ছাত্রছাত্রীরা অপমানিত বোধ করে।
ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, রোম স্ট্যাটিউট অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট’-এর ৭ অনুচ্ছেদে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ‘ওয়াইডস্প্রেড অ্যাটাক’ এবং ‘সিস্টেম্যাটিক অ্যাটাকের’ কথা বলা আছে। এ দুই ধরনের অপরাধ শেখ হাসিনা করেছেন।”
অন্যদিকে শেখ হাসিনার আইনজীবী মো. আমির হোসেন যুক্তিতর্ক শুনানিতে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে মূল এভিডেন্স অ্যাক্ট প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। সিআরপিসিও এ আইনে গ্রহণ করা যায় না। এ আইনে বিচার মানে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দিয়ে আসামীকে বলা হবে, ‘এখন সাঁতার কাটো’।
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র অভিযোগের বিষয়ে আমির হোসেন বলেন, যদি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকে বৈধও ধরে নেওয়া হয়, সেই আন্দোলনকেও নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ভুলত্রুটি থাকতে পারে। সেগুলো মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।