ডিজিএফআইয়ের জেআইসিতে দীর্ঘ আট বছরের গুমজীবনের ভয়াবহ বর্ণনা তুলে ট্রাইব্যুনালের কাছে বিচার চেয়েছেন ভুক্তভোগী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী। তিনি জবানবন্দীতে বলেছেন, ঘুমানোর জন্য দেওয়া তোষকে শত শত ছারপোকা ছিল। কামড়ে পুরো শরীর ও কাপড় রক্তাক্ত হয়ে যেত। রক্তমাখা কাপড় নিয়ে নামায পড়তে সমস্যার কথা জানিয়ে আলাদা লুঙ্গি চাইলেও দেওয়া হয়নি। আগে যা দিয়েছিল তা ছিল নিম্নমানের। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ছিঁড়ে গিয়েছিল। ছেঁড়া জায়গায় সেলাই করতে করতে দর্জিও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য নিজেই হাতে সেলাইয়ের জন্য সুঁই-সুতা চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা দেননি। শেষ পর্যন্ত ছেঁড়া জায়গায় গিট্টু দিয়ে ব্যবহার করতে হয়েছিল।

গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো জবানবন্দী দেন। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ। জবানবন্দী সম্পন্ন হলেও আসামীপক্ষের আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেরার জন্য আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) দিনধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

এ বিষয়ে আযমী বলেন, অপহরণকারীদের একজনকে আমি চিনতে পেরেছি বলে ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছি। জেআইসিতে রাখা কক্ষটিও আমি চিনতে পেরেছি। কারণ ওই সেলের দক্ষিণে ঢাকা স্টেশন অফিসার্স মেস-বি রয়েছে। অর্থাৎ আমাকে অপহরণের পরদিন ভোরের আলোয় ভেন্টিলেটর দিয়ে সেই পুরাতন মেস দেখতে পেয়েছি। এছাড়া ওখানে কয়েকজন আমাকে নিশ্চিত করেছেন এটা ডিজিএফআইয়ের কয়েদখানা, যা আয়নাঘর নামে পরিচিত।

জবানবন্দীতে আযমী বলেন, ঘুমানোর জন্য দেওয়া তোষকে শত শত ছারপোকা ছিল। কামড়ে পুরো শরীর ও কাপড় রক্তাক্ত হয়ে যেত। রক্তমাখা কাপড় নিয়ে নামায পড়তে সমস্যার কথা জানিয়ে আলাদা লুঙ্গি চাইলেও দেওয়া হয়নি। আগে যা দিয়েছিল তা ছিল নিম্নমানের। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ছিঁড়ে গিয়েছিল। ছেঁড়া জায়গায় সেলাই করতে করতে দর্জিও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য নিজেই হাতে সেলাইয়ের জন্য সুঁই-সুতা চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা দেননি। শেষ পর্যন্ত ছেঁড়া জায়গায় গিট্টু দিয়ে ব্যবহার করতে হয়েছিল।

তিনি বলেন, আমাকে অপহরণের এক মাস পর ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৫০ মিনিটে একজন কর্মকর্তা বলেন- একটি অঘটন ঘটার আশঙ্কায় আপনাকে নিয়ে আসা হয়েছিল। সেই শঙ্কা কেটে গেছে। এখন আপনাকে মুক্তি দেওয়ার সময় এসেছে। তার কাছে জানতে চাইলাম- আমি কি মুক্তির জন্য ঘণ্টা নাকি দিন গুনবো। ওই কর্মকর্তা জবাব দিলেন- আপনি একজন জেনারেল। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারেন যে, আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসতে হবে। এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারবো না।

এর এক মাস পর ১৯ অক্টোবর প্রথমবারের মতো আযমীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একই বছরের ২২ অক্টোবর ও ৭ ডিসেম্বর আরও দুবার জিজ্ঞাসাবাদ করেন তারা।

জিজ্ঞাসাবাদ প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনালে এই ভুক্তভোগী বলেন, তারা বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে আমার কথাবার্তা, পরিচয়, সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করতেন। তবে সবচেয়ে বেশি জানতে চাইতেন জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কিনা। এছাড়া ভারতের বিরুদ্ধে ফেসবুকে এত লেখালেখি করি কেন, তা নিয়েও প্রশ্ন করা হতো। জামায়াত প্রসঙ্গে আমি বলি- আমাকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করার সাত বছর দুই মাস পর আপনারা অপহরণ করেছেন। এই দীর্ঘদিন আপনাদের গোয়েন্দা বাহিনী আমার পেছনে ঘুরেছেন। জামায়াতের সঙ্গে আমার ন্যূনতম সম্পর্কের রিপোর্ট কি আপনাদের কাছে আছে? জিজ্ঞাসাবাদে আরও বলেছি- অন্যান্য দলের মতো জামায়াতে উত্তরাধিকারী সূত্রে কেউ নেতা হন না। আপনারা তো রাজনীতি নিয়ে অনেক গবেষণা করেন। একটি উদাহরণ দেখান, যেখানে জামায়াতের কোনো নেতা উত্তরাধিকার সূত্রে নেতৃত্ব পেয়েছে।

এসব বলার পরও তারা চাপাচাপি করতে থাকেন স্বীকার করার জন্য যে, আমি জামায়াতের আমীর হতে যাচ্ছিলাম। এতে আমি জবাব দেই- আমার বাবা জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আমীর বটে। তবে ওই দলের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। যেহেতু সম্পর্কই নেই, সেহেতু দলের আমীর হওয়ার প্রশ্ন হাস্যকর। এরপর তারা ভারতের বিরুদ্ধে আমার লেখালেখি নিয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

তখন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে আযমী বলেছিলেন, ভারতের বিরুদ্ধে যদি লেখালেখি দণ্ডনীয় অপরাধ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা না দিয়ে আদালতে সোপর্দ না করে এখানে অবৈধভাবে আটক রেখেছেন কেন। এছাড়া সেনাবাহিনীর ৩০ বছর চাকরিতে আমাকে শিখিয়েছে যে, ভারত আমাদের প্রধান শত্রু। এটা যদি অপরাধ হয় তাহলে এ সময়জুড়ে সেনাপ্রধানসহ যেসব জেনারেল আমাকে শিখিয়েছেন তারা একই অপরাধে অপরাধী। এমনকি স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে ভারতকে কখনও বন্ধুসুলভ আচরণ করতে দেখিনি আমি।

পরে কর্মকর্তা আমাকে বলেন, আমরা আপনাকে নিয়ে তদন্ত করছি। তদন্ত চলমান পর্যন্ত আপনাকে এখানে থাকতে হবে। জবাবে আমি বলি- কীসের তদন্ত। কোনো অঘটন সংঘটিত হওয়ার পর তদন্ত হয়। তাহলে আপনারা কীসের তদন্ত করছেন? জবাবে কর্মকর্তা বলেন- আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু করেছিলেন কিনা তা তদন্ত করা হচ্ছে। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কেয়ামত পর্যন্ত শেষ হবে না বলতেই তারা ক্ষুব্ধ আচরণ শুরু করেন।

ওই সময় তাদের কাছে জানতে চাই যে, আপনারা কি আমাকে মেরে ফেলবেন নাকি। জবাবে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, মেরে ফেলতে চাইলে তো আরও আগেই খাল-বিলে নিয়ে মেরে ফেলতাম।

তিন নম্বর সাক্ষী হিসেবে টানা দুদিন সাক্ষ্য দিয়েছেন আযমী। প্রথম দিনের জবানবন্দীতে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করাসহ কীভাবে, কোথা থেকে গুম করা হয়, তা তুলে ধরেন তিনি। দ্বিতীয় দিনে অবশিষ্ট জবানবন্দী শেষে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার চেয়ে ট্রাইব্যুনালের কাছে আর্জি জানানো হয়। এছাড়া তার জেরার জন্য আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত।

চব্বিশের ৫ আগস্টের পর সেনাপ্রধান দেখা করেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, উনি প্রথমে আমার সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করেছেন। এরপর লেফটেন্যান্ট জেনারেল শাহিনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সেনাপ্রধান নিশ্চিত করেন যে, ডিজিএফআই-ই আমাকে অপহরণ করেছিল। শাহিনের উপস্থিতিতে তিনি আমাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া এটার ওপর ভিত্তি করে তখন কর্মরত তিনজন জেনারেলকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। বাকি দুজন আগেই অবসর নিয়েছিলেন।

জেআইসি বা আয়নাঘর পরিদর্শনের বিষয়টিও ট্রাইব্যুনালে বর্ণনা দিয়েছেন আযমী। তিনি বলেন, সেলের যেখানে ভেন্টিলেটর ছিল না, সেখানে দেয়াল ভেঙে ভেন্টিলেটর করা হয়েছে। জানালাগুলো সব কালো রঙ দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, যেন বাইরে কিছু দেখা না যায়। ছোট ছোট কক্ষের মধ্যে যেসব দেয়াল ছিল, সেসব ভেঙে বড় দেখানো হয়েছে। লোহার গ্রিলের দরজা ভেঙে কাঠের লাগানো হয়েছে। কক্ষের মান অনেক ভালো দেখানো হয়েছে, যেসব ওরকম ছিল না।

ট্রাইব্যুনালে চাওয়া বিচার নিয়ে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, আমাকে অবৈধভাবে অপহরণ করে আট বছর মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়েছে। আমার অসুস্থ বিধবা মা, যার দেখাশোনা করতাম, অপহরণের তিন বছর পর তাকেও ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়েছে। স্ত্রী-সন্তানরাও কষ্টে দিন কাটিয়েছেন। আমি এ সবকিছুর জন্য সুবিচার প্রার্থনা করেছি।

২০১৬ সালের ২২ আগস্ট গুমের শিকার হন অবসরপ্রাপ্ত এই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট মুক্তি মেলে তার। তবে ২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বরের পর মুক্তির আগ পর্যন্ত আর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বলে জবানবন্দেিত জানিয়েছেন আযমী।