ট্রাইব্যুনালে সিরিয়াল কিলারের বিচার চলছে : চিফ প্রসিকিউটর

গুমের মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দীতে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছেন, বেসামরিক ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে ডিজিএফআইয়ের সেলে রাখা অভ্যাসে পরিণত হয়। বস্তুত যেকোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে এনে যা কিছু করা যায় ভেবে এমন মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর হয়ে যায় তাদের। অর্থাৎ যা ইচ্ছা তা-ই করা যায় ভাবতে শুরু করেন তারা। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালে মুখ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে ডিজিএফআই। বিভিন্ন সময়ে তারা লোকদের উঠিয়ে এনে নিজেদের সেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী-রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। তারা তারেক রহমানকেও তুলে এনে অমানবিক নির্যাতন করেন।

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দেওয়া জবানবন্দীতে এ কথা উল্লেখ করেন তিনি।

ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। ট্রাইব্যুনাল অন্য সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।

গতকাল দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে সাক্ষীর ডায়াসে ওঠেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। শুরুতেই তাকে শপথ পড়ানো হয়। এরপর নিজের পরিচয় দেন তিনি। ২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন এই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, আমি সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গুম ও খুনের সংস্কৃতি কীভাবে বেড়ে উঠেছে, সে ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে এসেছি। পাশাপাশি সেনাপ্রধান থাকাকালীন র‌্যাব নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে এসেছি। এরপর একে একে বিবরণ দিতে থাকেন ইকবাল করিম।

জবানবন্দীতে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, আমরা যদি ধরে নেই যে, ২০০৮ সাল থেকে সেনাবাহিনীতে খুন শুরু হয়েছে তা ভুল বলা হবে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই খুনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে। সে সময় কথিত অপরাধীদের ধরে সেনা ক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তবে তার সংখ্যা ছিল সীমিত। পরবর্তীতে তদন্ত আদালতের মাধ্যমে ও আইন প্রয়োগ করে সেসব নিয়মিত করা হয়েছে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অপারেশন চলাকালে বেশ কিছু মৃত্যু হয়েছে। যেসব কর্তৃপক্ষের নজরে আসায় দোষীদের যথাযথ শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

ইকবাল করিম বলেন, সামরিক বাহিনীর প্রধান কাজ হলো বহিঃশত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করা। তবে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সামরিক বাহিনীকে তাদের সাহায্যে সময়ে সময়ে মোতায়েন করা হয়। এছাড়া দুর্যোগকালীন মুহূর্তেও মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনীকে। এমনকি নির্বাচনের সময়েও মোতায়েন করা হয়। সবার ধারণা সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। তাই এটি একটি অলিখিত নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, সেনাবাহিনীকে যখনই বাইরে মোতায়েন করা হয়, তখন অধিনায়কদের মনে সার্বক্ষণিক চাপ থাকে তাদের কত তাড়াতাড়ি সেনানিবাসে ফেরত আনা হবে। কারণ তাদের প্রত্যেকের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে। তাদের প্রশিক্ষণ 'এক গুলি, এক শত্রু' নীতির ওপর পরিচালিত হয়ে থাকে। বস্তুত এটি না হলে সেনাবাহিনী কখনও যুদ্ধ করতে পারবে না। এজন্য প্রশিক্ষণকালে সেনা সদস্যদের ডি-হিউম্যানাইজ করা হয়। তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ মনে করা ভুলে যায়। মানুষকে টার্গেট বলতে শুরু করে। ফায়ারিং রেঞ্জে মানুষ আকৃতির টার্গেটের ওপর গুলি করে তাদের মানুষ হত্যার মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করা হয়। এ কথা মনে রেখে সেনাবাহিনীকে কখনও বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি। অথচ সেটাই ঘটেছে ২০০৩ সালে যখন র‌্যাব গঠন করা হয়। এটি ছিল একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। সেনা সদস্যদের যে প্রশিক্ষণ তা র‌্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না।

জবানবন্দীতে ইকবাল করিম বলেন, বেসামরিক ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে ডিজিএফআইয়ের সেলে রাখা অভ্যাসে পরিণত হয়। বস্তুত যেকোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে এনে যা কিছু করা যায় ভেবে এমন মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর হয়ে যায় তাদের। অর্থাৎ যা ইচ্ছা তা-ই করা যায় ভাবতে শুরু করেন তারা। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালে মুখ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে ডিজিএফআই। বিভিন্ন সময়ে তারা লোকদের উঠিয়ে এনে নিজেদের সেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী-রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। তারা তারেক রহমানকেও তুলে এনে অমানবিক নির্যাতন করেন।

এ সময় সেনাবাহিনী পরিচালিত অপারেশন ক্লিন হার্টের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। জবানবন্দীতে সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। র‌্যাব গঠনের আগে অপারেশন ক্লিন হার্টেও অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেনাসূত্র অনুযায়ী ১২ জন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে এ সংখ্যাটি ছিল ৬০ জন। পরবর্তীতে ক্লিন হার্টের সব সদস্যকে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়। বস্তুত এই দায়মুক্তি ছিল হত্যার লাইসেন্স প্রদান। অর্থাৎ লাইসেন্স টু কিল।

এদিকে, গতকাল সকালে কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। এ মামলায় তাকেই একমাত্র আসামী করা হয়েছে। গতকাল প্রথমে মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর শাইখ মাহদীসহ অন্যরা। আসামীপক্ষে রয়েছেন আইনজীবী নাজনীন নাহার ও মুনসুরুল হক চৌধুরী।

গত ১৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। একইসঙ্গে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনসহ সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য গতকালের দিন নির্ধারণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে গতকাল সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম, আজ আবারো সাক্ষ্যগ্রহণ হবে।

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের বিচারের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন আজ। দেশের ইতিহাসে সিরিয়াল কিলার হিসেবে যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করেছেন, তেমন একজনের বিচার এই ট্রাইব্যুনালে চলছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তার (জিয়াউল) বিরুদ্ধে বলপূর্বক অপহরণ-গুম করে মানুষদের হত্যা করার যে অভিযোগ প্রসিকিউশন এনেছে, সে মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। তিনি অত্যন্ত আলোচিত, মেধাবী ও অত্যন্ত দূরদর্শী একজন সেনাপ্রধান ছিলেন। জবানবন্দীতে কীভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব নষ্ট করা হয়েছে; তা তুলে ধরেছেন জবানবন্দীতে।

তাজুল ইসলাম বলেন, একজন সাবেক সেনাপ্রধান হিসেবে সেনাবাহিনীকে রক্ষা করার জন্য যত ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তিনি সেই ব্যবস্থাগুলো কীভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছেন এবং তার চেষ্টাগুলোকে কীভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তারিক আহমেদ সিদ্দিকের নেতৃত্বে একটা যে চক্র তৈরি হয়েছিল, তারা কীভাবে এটাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সেই কথাগুলো আদালতের সামনে তুলে ধরেছেন তিনি। এছাড়া কীভাবে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদ তৈরির মাধ্যমে একটা ডিপ স্টেট তৈরি করা হয় এবং সেনাবাহিনীর কমান্ডের বাইরে আরেকটি কমান্ড স্ট্রাকচার তৈরি করা হয়। সেই কমান্ড স্ট্রাকচারকে দিয়ে সেনাবাহিনীর কোনো অংশকে দিয়ে তাদের নানা ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম করা হয়েছে বলে তিনি সাক্ষ্যতে বলেছেন।

সর্বোপরি সাবেক এই সেনাপ্রধান যার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন, তিনি সেই সময়ে কর্নেল জিয়া নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি কীভাবে মানুষ হত্যা করেছেন, র‌্যাবে গিয়ে গুমপূর্বক মানুষ হত্যার ব্যাপারে তার যে দক্ষতা ও বেপরোয়া মনোভাব ছিল, সেসব বিষয়ে আদালতে তুলে ধরেছেন বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।