জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। রুলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ কেন অবৈধ হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলাম শাহীনের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, জাতীয় ঐক্যমত কমিশন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার সহ সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম, আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব। রিটের বিরোধিতা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু, ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। তাদের সহযোগিতা করেন আইনজীবী জহিরুল ইসলাম মূসা, আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন, আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী। এর আগে গতকাল সোমবার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে পৃথক রিট দায়ের করা হয়।
রিটে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বাতিল চাওয়া হয়। এছাড়া সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ অবৈধ ঘোষণার নির্দেশনা চাওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌধুরী রেদোয়ান-ই খোদা রনি ও অ্যাডভোকেট গাজী মো. মাহবুব আলম রিট দুটি দায়ের করেন। এদিকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জুলাই জাতীয় সনদ বাতিল ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণার নির্দেশনা চেয়ে আরেকটি রিট দায়ের করা হয়। রিটে জুলাই জাতীয় সনদের কার্যকারিতা স্থগিত চাওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন।
রিটে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, জাতীয় ঐক্যমত কমিশন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার সহ সংশ্লিষ্টদের রিটে বিবাদী করা হয়েছে।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ প্রশ্নে রুল জারির পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির বলেছেন, যদি বাংলাদেশে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ না থাকে, ৩০টি কনসেনসাসের ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাব না থাকে, গণভোটের প্রশ্নও অবৈধ হয়। তাহলে শেষ পর্যন্ত থাকবে কী? শেষ পর্যন্ত কি নির্বাচন থাকে? সরকার থাকে? নিজের গদি থাকে? সবকিছুই বড় ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন। তো এই দায় দায়িত্ব তাদেরকে নিতে হবে।
এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌধুরী মো. রেদোয়ান-ই-খোদা। আর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং এর আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যের শপথের জন্য গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দেয়া চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত সপ্তাহে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী মো. মাহবুব আলম। রিটকারীদের দুজনই বিএনপিপন্থী আইনজীবী।
শিশির মনির বলেন, সংবিধানের জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ কেন অসাংবিধানিক হবে না এটি একটি রুল। আরেকটি রুল হলো সংসদ সদস্যদেরকে শপথ বাক্য পাঠ করানোর জন্য যে চিঠি দেয়া হয়েছিলো ওই চিঠির দ্বিতীয় অংশ সংবিধান সংশোধন সভার সদস্য হিসেবে শপথ নেয়াটা কেন অবৈধ হবে না এটি আরেকটি রুল। আরেকটি রুল হলো গণ ভোটের সেকশন তিনে যে চারটি প্রশ্ন দেয়া আছে সেটি কেন অবৈধ হবে না? এটি আরেকটি রুল। আর আরেকটি হলো ওই গণভোট অর্ডিন্যান্সের তফসিলের ৩০ টি ঐক্যমতের ভিত্তিতে যে ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছিলো সেটিকে কেন অবৈধ করা হবে না? এটি হলো আরেকটি রুল। এই চারটি সেপারেট রুল জারি হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি ৫ই আগস্টের পরে যে সংস্কার কর্মকান্ড পরিচালনা করার জন্য যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো সেই উদ্যোগটাকে রাজনৈতিক ঐক্যের বাইরে নিয়ে এসে আদালতের সাবজেক্ট ম্যাটার বানানো হলো। অতীতেও আদালতের সাবজেক্ট ম্যাটার বানানো হয়েছে যে সমস্ত বিষয়কে যেগুলো রাজনৈতিকভাবে সেটেল করার বিষয় ছিল তার কোনোটারই ভালো ফলাফল আমরা দেখতে পাইনি। ৩০টি বিষয়ে যেখানে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল একমত হলো সেই ৩০টি বিষয়কেও রুলের অধীনে কার ইনস্ট্রাকশনে আনা হলো এটি আমরা এখনো পর্যন্ত বোধগম্য নই।
শিশির মনির বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি এই রিট মামলা শুনানি করার ক্ষেত্রে এবং এই রিট মামলাটি পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সরকারের একাংশের ডাইরেক্ট সংশ্লিষ্টতা দেখা যাচ্ছে। ফলে আমরা ধরে নিতে পারি যে সরকার এই সংস্কার প্রস্তাবকে পার্লামেন্টকে বাইপাস করে কোর্টের মাধ্যমে সেটেল করে এক ধরনের স্থিতাবস্থা বা এক ধরনের সুবিধা নেয়ার জন্য চেষ্টা করছেন। আবার সরকারকে মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে দ্বিচারিতা করছেন। এই দ্বিচারিতার অংশ হিসেবে গত কালকে তারা প্রস্তাব পাঠিয়েছেন ডেপুটি স্পিকারকে বিরোধী দল থেকে দেয়া হবে। অথচ এটা ৩০টি প্রস্তাবের মধ্যে আছে এবং সবাই একমত হয়েছিল। এটাকে আজকে রুলের অংশ করা হয়েছে। একদিকে বলছেন ডেপুটি স্পিকার দেয়া হবে, নাম প্রস্তাব করেন। আরেকদিকে নিজস্ব ইন্সট্রাকশনে ইনডাইরেকলি রিট পিটিশন দায়ের করে সংস্কার প্রস্তাবকে আদালতের সাবজেক্ট ম্যাটার বানাচ্ছেন। এটার নাম হলো দ্বিচারিতা।
তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি একটি রাজনৈতিক দল নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারার চেষ্টা করছে। যদি বাংলাদেশে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ না থাকে, ৩০টি কনসেনসাসের ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাব না থাকে, গণভোটের প্রশ্নও অবৈধ হয়। তাহলে শেষ পর্যন্ত থাকবে কি? শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থাকে? সরকার থাকে? নিজের গদি থাকে? সবকিছুই বড় ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন। তো এই দায় দায়িত্ব তাদেরকে নিতে হবে। যারা এই প্যান্ডোরার বক্স ওপেন করাচ্ছেন, দে হ্যাভ টু টেক দ্যা রেস্পন্সিবিলিটি অন দেয়ার সোল্ডার। জাতীয় জীবনের এত বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ডিজাইন করে আদালতের সাবজেক্ট ম্যাটার বানিয়ে পার্লামেন্টকে পাশ কাটানোর যে কৌশল, এটি অতীতেও ভালো কোনো কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়নি।’