প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে রাজধানীর মিরপুরে গুলীতে দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন আসামী তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিদ্দিক আজাদ শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। এর আগে বুধবার মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুরের ডিওএইচএসের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

রিমান্ড শুনানিকালে আদালতের অনুমতি নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন মামুন খালেদ। তিনি বলেন, ‘এক-এগারোর সময় আমি কুমিল্লায় কর্মরত ছিলাম। সে সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জামিনের ব্যাপারে আমি সরাসরি ভূমিকা পালন করেছি।’ আয়নাঘর প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, তার মেয়াদে কোনও অভিযোগ ছিল না এবং তিনি এ বিষয়ে একাধিকবার শুনানিতে অংশ নিয়েছেন। জলসিঁড়ি প্রকল্প নিয়ে তিনি বলেন, ‘নজরুল সাহেব নামে একজনের ১৫০০ কোটি টাকা উদ্ধারের দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছিল, আমি শুধু সেই উদ্ধার প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলাম।’ এছাড়া মামলার ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না এবং দীর্ঘ সময় ধরে সিভিলিয়ান হিসেবে জীবনযাপন করছেন বলে জানান।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। তিনি বলেন, ‘আসামী মামুন খালেদ এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব ছিলেন। পরবর্তীকালে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে সহযোগিতা করায় পুরস্কারস্বরূপ তাকে ডিজিএফআই প্রধান করা হয়। তার আমলেই আয়নাঘর তৈরি করে সাধারণ মানুষকে নির্যাতন ও পুড়িয়ে মারার মতো অপরাধ করা হয়েছে। পিপি আরও অভিযোগ করেন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাসা থেকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়ার নেপথ্যে ছিলেন এই মামুন খালেদ। তার নির্দেশেই গত ১৯ জুলাই মিরপুরে ছাত্র-জনতার ওপর গুলী চালানো হয়, যাতে দেলোয়ার নামে এক ব্যক্তি নিহত হন।

এছাড়া জলসিড়ি প্রকল্পের কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার কথাও তোলেন পিপি। যে-কারণে ইতোমধ্যে আদালত তার স্ত্রীসহ বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞা দেন বলে জানান ওমর ফারুক ফারুকী।

আসামীপক্ষের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন ও নজরুল ইসলাম রিমান্ড বাতিলপূর্বক জামিন আবেদন করেন। তারা দাবি করেন, মামলার এজাহারে মামুন খালেদের নাম নেই এবং ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। ২০১৬ সালে তিনি অবসরে গিয়েছেন এবং একজন পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে তিনি শুধু দায়িত্ব পালন করেছেন। খালেদা জিয়ার বাসা উচ্ছেদের সময় তিনি ‘অন ডিউটি’ কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি আদেশ পালন করেছিলেন মাত্র। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, গত ১৯ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলায় দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি গুলীবিদ্ধ হন এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী লিজা বাদী হয়ে মিরপুর মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ জানায়, হত্যাকা-ের রহস্য উদঘাটন ও নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করতে আসামীকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। এর আগে, বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর ডিওএইচএস এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকালে মিরপুর-১০ নম্বর ফলপট্টি এলাকায় আন্দোলনরত ছাত্রজনতার ওপর এজাহারভুক্ত আসামীসহ ৫০০-৭০০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি হামলা চালায়। তারা বিভিন্ন দিক থেকে গুলী ছোড়ে। এতে দেলোয়ার হোসেন গুলীবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে প্রথমে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে এবং পরে শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ জুলাই সকালে তার মৃত্যু হয়।

শেখ মামুন খালেদ ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে ডিজিএফআইতে পরিচালক (এফএসআইবি) হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০০৮ সালের জুনে তিনি ব্রিগেডিয়ার চৌধুরী ফজলুল বারির স্থলাভিষিক্ত হয়ে পরিচালকের (কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর-সিআইবি) দায়িত্ব পালন করেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১১ সালে শেখ মামুন মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে ডিজিএফআইতে ফিরে আসেন। প্রায় দেড় বছর এই দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। সে সময় রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের নিপীড়নসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।