তিনজনের যাবজ্জীবন, বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া তিনজনকে যাবজ্জীবন, পাঁচজনকে ১০ বছর, আটজনকে ৫ বছর ও ১১ জনকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একজনের হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে মর্মে গণ্য করা হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন। রায় পড়ার শুরতেই এজলাসে আসন গ্রহণের পর প্রধান কৌঁসুলি জানান, রায়টি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-তে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
এরপর ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম বলেন, আজ আমরা এমন একটি মামলার রায় ঘোষণা করছি, সেটি হলো ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার মামলা। এ সময় ট্রাইব্যুনাল মস্তব্য করেন, যে মানুষগুলোর সামনে আবু সাঈদ বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি ভেবেছিলেন সবাই মানুষ। কিন্তু না, তারা সেদিন সবাই ‘অমানুষে’ পরিণত হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে অকুতোভয় চিত্তে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, তার সামনে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা মানুষ, তাই তার কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু তিনি তখন বুঝতে পারেননি যে, সেই মানুষগুলো অমানুষ হয়ে গেছে।’
গতকাল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মামলার সংক্ষিপ্ত রায় পড়া শুরু হয়। ট্রাইব্যুনালের বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর এ রায় পাঠ করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে বহুল প্রতীক্ষিত এ মামলার রায় ঘোষণা শেষ করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।
যাবজ্জীবনসাজাপ্রাপ্ত তিনজন হলেন- সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।
১০ বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেন- রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ এবং ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।
৫ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া আসামীরা হলেন- আরএমপির সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন।
তিন বছরের সাজা পাওয়া আসামীরা হলেন- বেরোবির সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গেস্নারিয়াস ফজলে রাব্বী, সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবির এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল, এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু ও সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া।
এ ছাড়া বেরোবির প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৩০ আসামীর মধ্যে ৬ জন গ্রেপ্তার আছেন। তারা হলেনÑ এএসআই আমির হোসেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ। তাদের সাইকে গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বাকি আসামীরা পলাতক।
মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ সাক্ষ্য দিয়েছেন ২৫ জন। তারকা সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দিয়েছেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও বর্তমান এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ। তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিনের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে এ মামলার ৩০ আসামীর আলাদা আলাদা দায়। তার জবানবন্দীতে নিজের তদন্তে পাওয়া ৩০ আসামীর সবার ব্যক্তিগত দায় ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন তিনি।
রায়ে অসন্তোষ, আপিলে খালাসের আশা
আবু সাঈদ হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিন আসামীর আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। মামলার গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গেছে উল্লেখ করে আপিলে নতুনভাবে তুলে ধরা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা জানান।
আসামী আনোয়ার পারভেজ, এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ের পক্ষে লড়েছেন আইনজীবী দুলু। রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ অনুযায়ী আনোয়ার পারভেজ একটি অভিযোগে হাজতবাসকালীন দণ্ড পেলেও বাকি অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন। আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে চারটি থেকে খালাস পেলেও একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন।
দুলু বলেন, আবু সাঈদের জব্দকৃত গেঞ্জিতে গুলির কোনো ছিদ্র পাওয়া যায়নি বলে আমরা যুক্তিতর্কে তুলে ধরেছিলাম। এছাড়া গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্বাভাবিক কোনো চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়নি। মরদেহে এক্স-রে বা রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা না করায় গুলির অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। একজন মানুষ গুলিতে নিহত হলে শরীরে সুস্পষ্ট প্রভাব থাকার কথা। কিন্তু এখানে সেই ধরনের আলামত অনুপস্থিত।
এই আইনজীবী বলেন, মামলায় আমরা লিখিত ও মৌখিক যুক্তিতর্কে যেসব ভিত্তিতে আসামীদের খালাস চেয়েছিলাম সেসব বিষয় পরিষ্কার হয়নি। কারণ আজ ‘সাবস্ট্যান্স অব ফাইন্ডিং’ এবং ‘অপারেটিভ পার্ট অব দ্য জাজমেন্ট’ ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। অর্থাৎ রায়ের ডিগ্রি ও শাস্তির অংশ শুনেছি আমরা।
তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি সংগ্রহের জন্য এরই মধ্যে আবেদন করা হয়েছে। রায় হাতে পাওয়ার পর বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে আপিল বিভাগে আপিল করা হবে। আশা করছি আপিলে ন্যায়বিচার পাবো।