গুম করে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সেনা কর্মকর্তাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনে রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিশনের শুনানি শেষ। এখন আসামী পক্ষের শুনানির জন্য আগামী ৯ ডিসেম্বর পরবর্তী দিন ঠিক করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্যরা হলেন, বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আদালতে গতকাল রাষ্ট্র পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এসময় তিনি বলেন, এসব গুমের সরাসরি নির্দেশ দিতেন শেখ হাসিনা।
এর আগে শুনানির নির্ধারিত দিনে আটক তিন আসামী ও সেনা কর্মকর্তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। সকাল সোয়া ১০টার দিকে বাংলাদেশ প্রিজন ভ্যানে করে তাদেরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা হয়।
তিন আসামী হলেন, পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। তারা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বিশেষ কারাগারে ছিলেন।
ছিল না আলো-বাতাস কিংবা জানালা। শুধু ছিল বিকট শব্দ আর ভয়ানক অন্ধকার। আজানের মতো পবিত্র ধ্বনি কানে পৌঁছানো ঠেকাতে চালানো হতো এগজস্ট ফ্যান। কখনো আবার সাউন্ড বক্সে বাজানো হতো গান। এমনকি ২৫ জন বন্দীকে একটি ব্রাশ ব্যবহারে বাধ্য করা হতো। মুখ মুছতে হতো নোংরা গামছায়। জেআইসি সেল বা আয়নাঘর নিয়ে এমনই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।
জেআইসি সেলে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক-বর্তমান ১৩ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন ধার্য ছিল রোববার (৭ ডিসেম্বর)। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। শুনানিতে বন্দীদের দেওয়া বিভিন্ন বিবরণ দেন তিনি।
পরে প্রেস ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ডিজিএফআইয়ের সদর দপ্তরের দক্ষিণ পাশে মেস-বি এর মাঝে একটি দোতলা ভবনে ছোট ছোট খোপের মতো বন্দীশালা ছিল। এতে ছিল মোটা রডের গ্রিল ও বাইরে ছিল ঢাকনা। ভেতরে কোনো আলোর ব্যবস্থা ছিল না। প্রত্যেকটা সেলের ভেতরে সিসি ক্যামেরা লাগানো থাকত। ছোট ভেন্টিলেটর ছিল। এ ছাড়া যখনই আজান হতো তখন এগজস্ট ফ্যান চালানো থাকত। কখনো কখনো উচ্চশব্দে সাউন্ড বক্সে গান বাজানো হতো। বন্দীরা যেন আজান বা বাইরের কোনো শব্দ শুনে বুঝতে না পারেন এটা কোন জায়গা।
তাজুল ইসলাম বলেন, সেলের ভেতরে থাকা এগজাস্ট ফ্যানও চালিয়ে দেওয়া হতো। ফলে অসহ্য শব্দে অনেকের কান বধির হয়েছে। তারা বাইরের কোনো আওয়াজ শুনতে পেতেন না। কখনো কখনো কোনো বন্দী এগজস্ট ফ্যান চালানোর আগেই হয়ত মসজিদের মাইক থেকে আজানের শব্দ শুনেছেন। কখনো জুমার খুতবা শুনেছেন। কখনো ঘোষণা শুনেছেন যে এই এলাকার অমুক ব্যক্তি ইন্তেকাল করেছেন। তার জানাজা অমুক মসজিদে এতটা সময় অনুষ্ঠিত হবে, কেউ কেউ এটা শুনে ফেলেছেন। তাদের এই শব্দ নিয়ন্ত্রণের পরও তা থেকে বুঝতে পেরেছেন যে এটা ডিজিএফআইয়ের এই জায়গায় অবস্থিত একটা সেল।
শেখ হাসিনার পতনের পর তদন্ত সংস্থার সঙ্গে বন্দীশালা পরিদর্শনে যান ২৬ ভুক্তভোগী। তখন নিজেরাই এসব সেল চিহ্নিত করেন। কেননা, দেয়ালের কোনায় কেউ কেউ নাম লিখে এসেছিলেন। এ ছাড়া অন্যান্য আলামত দেখে গুমের সময় রাখা স্থানগুলো শনাক্ত করেছেন। এসব বন্দীশালা ভিডিও করে নিয়ে আসা হয়েছে বলে শুনানিতে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর। যা ট্রায়ালে তুলে ধরার কথা জানিয়েছেন।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, বন্দীশালায় সবসময় ২০-২৫ জন বন্দী থাকতেন। সবার ব্যবহারের জন্য বাথরুমের সামনে একটা নোংরা গামছা টানিয়ে রাখা হতো। এই একটা গামছা দিয়েই হাত-মুখ মুছতেন সবাই। গোসলের সময়ও ব্যবহার করতে হতো। ফলে অ্যালার্জিসহ নানা চুলকানি রোগে আক্রান্ত হতেন বন্দীরা। নোংরা গামছায় মুখ মোছার কারণে প্রায় সবারই চোখ উঠত। এ ছাড়া টুথব্রাশ রাখা হতো একটি। সেই ব্রাশই ২৫ জনকে ব্যবহার করতে বলা হতো। একজন মানুষকে কতটা অমানবিক পরিবেশে রাখা যায়, তার ব্যবস্থা ছিল জেআইসি সেলে। এখানেই গেল ১৫ বছর বিরোধী মতাদর্শের লোকদের গুম করে রাখা হয়েছিল। আর এসব কারণে আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন।
ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানীতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, আয়নাঘরে ছিল না আলো-বাতাস কিংবা জানালা। শুধু ছিল বিকট শব্দ আর ভয়ানক অন্ধকার। আজানের মতো পবিত্র ধ্বনি কানে পৌঁছানো ঠেকাতে চালানো হতো এগজস্ট ফ্যান। কখনো আবার সাউন্ড বক্সে বাজানো হতো গান। এমনকি ২৫ জন বন্দীকে একটি ব্রাশ ব্যবহারে বাধ্য করা হতো। মুখ মুছতে হতো নোংরা গামছায়। জেআইসি সেল বা আয়নাঘর নিয়ে এমনই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ডিজিএফআইয়ের সদর দপ্তরের দক্ষিণ পাশে মেস-বি এর মাঝে একটি দোতলা ভবনে ছোট ছোট খোপের মতো বন্দীশালা ছিল। এতে ছিল মোটা রডের গ্রিল ও বাইরে ছিল ঢাকনা। ভেতরে কোনো আলোর ব্যবস্থা ছিল না। প্রত্যেকটা সেলের ভেতরে সিসি ক্যামেরা লাগানো থাকত। ছোট ভেন্টিলেটর ছিল। এ ছাড়া যখনই আজান হতো তখন এগজস্ট ফ্যান চালানো থাকত। কখনো কখনো উচ্চশব্দে সাউন্ড বক্সে গান বাজানো হতো। বন্দীরা যেন আজান বা বাইরের কোনো শব্দ শুনে বুঝতে না পারেন এটা কোন জায়গা।
শেখ হাসিনার পতনের পর তদন্ত সংস্থার সঙ্গে বন্দীশালা পরিদর্শনে যান ২৬ ভুক্তভোগী। তখন নিজেরাই এসব সেল চিহ্নিত করেন। কেননা, দেয়ালের কোনায় কেউ কেউ নাম লিখে এসেছিলেন। এ ছাড়া অন্যান্য আলামত দেখে গুমের সময় রাখা স্থানগুলো শনাক্ত করেছেন। এসব বন্দীশালা ভিডিও করে নিয়ে আসা হয়েছে বলে শুনানিতে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর। যা ট্রায়ালে তুলে ধরার কথা জানিয়েছেন।
এর আগে গত ২৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য গতকালের এই দিন ধার্য করেন। জেআইসিতে গুমের মামলার গ্রেফতারকৃত আসামী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী, মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী কারাগারে আছেন।
শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, খুনের মামলায় গত ২২ অক্টোবর এই তিনজনসহ দুই মামলায় ১৩ সেনা কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। পরে তাদের ঢাকা ক্যান্টমেন্টে সরকার ঘোষিত বিশেষ কারাগারে রাখা হয়।
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের ঘটনায় ৮ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়। শুনানি শেষে সেদিন ট্রাইব্যুনাল আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুমের অভিযোগে আসামী শেখ হাসিনা ও তারেক সিদ্দিকীসহ ১৭ জন। জয়েন্ট ইন্টারোগেশন (জেআইসি) সেলে গুমের ঘটনায় আসামী শেখ হাসিনা ও তারিক সিদ্দিকীসহ ১৩ জন। এই ৩০ জনের মধ্যে হাসিনা ও তারিক সিদ্দিকী দুটি মামলায়ই আসামী। ফলে আসামী সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮। এদের মধ্যে ১৩ জন গ্রেফতার হয়েছেন, বাকিরা পলাতক।