মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস : রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তার বাবা মকবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা বেগম। এদিকে বেরোবি ভিসি ডক্টর মুহাম্মদ শওকাত আলী রায়ে প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা সন্তুষ্ট প্রকাশ করেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর জাফর পাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে রায়-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া রায়ে এই অসন্তোষ জানান তারা। তবে রায়ে বিচার হওয়ায় আংশিক সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তারা বলেছেন. পলাতক আসামীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে তাদের শাস্তি দিতে হবে। একই সাথে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আবু সাঈদের পরিবার ও সহপাঠীরা। তাদের অভিযোগ, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেকেই যথাযথ শাস্তি পায়নি, ফলে এই রায় ন্যায়বিচারের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার বহুল আলোচিত শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ দুই আসামীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পরও ক্ষোভ থামেনি পরিবারের এবং সহপাঠিসহ এলাকাবাসীর মধ্যে।
সাংবাদিকদের সামনে নিজের প্রতিক্রীয়া জানিয়ে শহীদ আবু সাঈদের পিতা মকবুল হোসেন বলেন, এই হত্যাকান্ডে মাত্র দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি পোমেল বড়ুয়া আমার ছেলেকে গলা টিপে ধরেছিল তার সর্বোচ্চ শাস্তি হলো না। আরও কঠোর সাজা দেয়া দরকার ছিল। আরো অনেককে ফাঁসি দেয়া দরকার। অনেক অপরাধী পালিয়ে গেছে। বড় অপরাধীদের এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। পুলিশের বড় কর্মকর্তাদের বাঁচিয়ে দিয়ে ছোটদের সাজা দেয়া হয়েছে। তিনি সরকারের নিকট দাবি জানান, যারা পালিয়ে গেছে তাদের ধরে এনে ফাঁসি দিতে হবে। এসময় আইনজীবীদের সাথে পরামর্শ করে পরবর্তীতে পরিবারের পক্ষে থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে তিনি জানান।
শহীদ আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগমের কণ্ঠেও ছিল একই ধরনের হতাশা। মনোয়ারা বেগম বলেন, তার ছেলের হত্যার পেছনে একাধিক ব্যক্তি দায়ী থাকলেও তাদের অনেকেই তুলনামূলক হালকা শাস্তি পেয়েছে, যা পরিবার মেনে নিতে পারছে না।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরাও রায়ের বিষয়ে আপত্তি করেছেন। তাদের দাবি, যারা গুরুতর অপরাধী ছিল তাদের অনেকেই লঘুদণ্ড পেয়েছে। তারা রায়ের পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তদের শাস্তি দ্রুত কার্যকরের আহ্বান জানান। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় সশস্ত্রভাবে হামলায় অংশ নেওয়া ছাত্র লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর মুহাম্মদ শওকাত আলী জানান, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রায় হওয়ায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা সন্তুষ্ট। তবে পৃথক আসামীদের শাস্তির বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে তিনি অনাগ্রহ প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের ওপরই ছেড়ে দেন।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। মামলায় মোট ৩০ জন আসামীর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৬ জন গ্রেপ্তার রয়েছে, বাকিরা পলাতক।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেইটে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আবু সাঈদ। ঘটনার একটি ভিডিও দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং আন্দোলনের গতি বদলে দেয়। এই হত্যা মামলাটি দ্রুত তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হলেও, রায়ের পর নতুন করে উঠে এসেছে ন্যায়বিচারের পরিপূর্ণতা নিয়ে বিতর্ক। পরিবার ও সহপাঠীদের দাবি, যখন প্রকৃত সব দায়ীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, বিচার তখনই সম্পূর্ণ হবে।