- বিদ্রোহের দিন পিলখানায় হিন্দি উচ্চারণে কথোপকথন
পিলখানায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এসব তথ্য এতদিন চাপা থাকলেও স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেয়ার পর বিভিন্ন ক্যাটাগরির ২৪৭ সাক্ষীর জবানবন্দিতে গা শিউরে ওঠা অনেক তথ্য মিলছে। কমিশনের প্রতিবেদনে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার নাম এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় গোয়েন্দাদের অংশগ্রহণ এবং পরিকল্পনায় প্রত্যক্ষ ভূমিকার একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিদ্রোহের দিন পিলখানায় হিন্দি ও ভিন্ন উচ্চারণে বাংলা ভাষার কথোপকথন শুনেছেন বলে একাধিক সাক্ষী জানিয়েছেন। ঘটনাকালে ৮২৭ জন ভারতীয় পাসপোর্টধারীর দেশে প্রবেশ এবং তাদের মধ্যে ৬৫ জনের কোনো বহির্গমন-তথ্য না থাকা-এটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র জানায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (বর্তমানে ভারতে পলাতক) শেখ হাসিনার ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার পরই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়। বিদ্রোহের শুরুতে পরিস্থিতি জানার পরও সেনা পাঠানো বিলম্বিত হওয়ায় হত্যাকারীরা পালানোর সুযোগ পায়।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ চলাকালে বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার পর হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় ১৩৯ জনকে মৃত্যুদ- এবং ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত। এছাড়া আরও অন্তত ২২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের ২৪শে ডিসেম্বর বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা পুনঃতদন্তের জন্য জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত রোববার প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন।
প্রতিবেদনে সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদসহ সামরিক বাহিনীর ১২ জন সাবেক কর্মকর্তা, র্যাবের চারজন, বিডিআরের তিনজন এবং পুলিশের বেশ কয়েকজন ঊর্ধতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতা, অবহেলা ও সন্দেহজনক আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে। অনেকেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও কার্যকর ব্যবস্থা নেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। কমিশন জানিয়েছে, ঘটনার সময় কিছু টিভি চ্যানেল ও অন্যান্য গণমাধ্যম যাচাইবাছাই ছাড়াই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে উত্তেজনাকর তথ্য প্রচার করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে এবং বিদ্রোহীদের মনোবল বাড়ায়। ১৪ নং কয়েদি সাক্ষীর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সিপাহী মইনুদ্দিন ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের মাঠে একটি বৈঠক ডাকেন। সেখানে সিপাহী সেলিম ও মইনুদ্দিনসহ আরো ১০-১২ জন ছিলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় যে সবাই দরবারের দিন রশি আর চাকু নিয়ে প্রস্তুত থাকবে জিম্মি করার জন্য। যেহেতু তারা সেনা অফিসার তারা তো আত্মরক্ষার চেষ্টা করবে। তাই সবার সঙ্গে চাকু রাখার পরিকল্পনা হয়। সেদিন রাতেই লে. কর্নেল শামস সাহেব সিপাহী সেলিম এবং মইনুদ্দিনকে ডাকে। সেখানে তিনি তাদেরকে বলেন, ‘আগামীকাল কোয়ার্টার গার্ডে ডিউটিতে থাকবে মেজর রিয়াজ। তোমরা সেখানে গেলে সে তোমাদের অস্ত্র দিয়ে দেবে।’
৬৫ নাম্বার সাক্ষীর বরাতে বলা হয়, সেন্ট্রাল কোয়ার্টার গার্ডে তিনটি ব্যাটালিয়নের (২৪, ৪৪ এবং সদর ব্যাটালিয়ন) এর অস্ত্র রক্ষিত ছিল। ঘটনার পূর্বে ২১ ফেব্রুয়ারি থেকেই অফিসাররা কোয়ার্টার গার্ডে ডিউটি দিয়ে আসছিলেন। এই ডিউটি দেওয়ার বিষয়ে মেজর রিয়াজ জিএসও-২ (আই) মেজর মাহমুদকে জিজ্ঞাসা করলে মেজর রিয়াজকে তিনি জানান যে উড়ো চিঠি আছে, তাই বাড়তি সতর্কতা। এর বেশি কিছু তিনি জানাননি। ৪৫ নাম্বার সাক্ষীর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, পিলখানার কমান্ড এনভায়রনমেন্টে কাঠামোগত সমস্যা ছিল। অফিসার সৈনিকদের গ্যাপ বেড়ে গিয়েছিল। অফিসার এবং তাদের পরিবারের আচরণে পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। ইনফ্যান্ট্রি ছাড়া অন্যান্য আর্মস এবং সার্ভিসের অফিসারদের আধিক্য অফিসার-জওয়ান সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছিল। দরবার হল ভাড়া দেওয়ার সময় কিছুটা স্বজনপ্রীতি ছিল। ওপেন টেন্ডার নীতিমালা অনুসৃত হয় নাই। বাবুল নামে ডিজির পরিচিত ব্যক্তিকে পুনঃ পুনঃ উক্ত লিজ দেওয়া হয়।
‘অপারেশন ডাল-ভাত’ নিয়েও অসন্তোষ: ১১৭ নাম্বার সাক্ষীর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ শুরু হওয়ার পরে প্রথম এক দেড়মাস পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু হলেও দিন দিন সৈনিকদের মধ্যে তা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সৈনিকরা অপারেশন ডাল-ভাতে নিদারুণ কষ্টের ভেতর দিন অতিক্রম করতো। প্রায়ই ৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক কর্তৃক ডকুমেন্টারি শাস্তি দেওয়া হতো। ডাল-ভাতের স্টলগুলোতে প্রথমদিকে জাল টাকা এবং পরিমাপের ঘাটতি মওকুফ করা হলেও একপর্যায়ে স্টলগুলোয় নিয়োজিত সৈনিকদের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনেও সৈনিকরা ছুটি পেত না। ডিডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী ছিলেন কড়া প্রকৃতির মানুষ। সেনা কর্মকর্তা হিসাবে বিডিআরে এসে সেনাবাহিনীর মতো প্রশিক্ষণকে কঠিন করে ফেলেছিলেন। ইউএন মিশনের জন্য বিডিআর সৈনিক নির্বাচনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী বেশ কিছু নিয়মনীতি আরোপ করেছিলেন, যার ফলে অনেকই মিশনে যাওয়ার জন্য অযোগ্য হয়ে পড়েন। এ বিষয়টি অনেকের মাঝে অসন্তোষের সৃষ্টি করেছিল ।বিডিআর হত্যাকা- তদন্তে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার নাম এসেছে। প্রতিবেদনে ১৪৬ নম্বর পয়েন্টে পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। তারা হলেন-তৎকালীন আইজিপি নূর মোহাম্মদ, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার নাইম আহমেদ, তৎকালীন অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি প্রধান) বাহারুল আলম, সাবেক (পলাতক) অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম, বিডিআর হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দ এবং তার অধীনস্থ তদন্ত দল।