চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাবের ওপর চালানো হামলা কোনো আকস্মিক সংঘর্ষ নয়; এটি ছিল আগাম প্রস্তুতি নেওয়া, পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলেছে, অভিযান শুরুর আগেই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সতর্ক হয়ে যায় এবং 'মানব ঢাল' কৌশল ব্যবহার করে র‍্যাবকে কার্যত কোণঠাসা করা হয়। এই হামলায় র‍্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক আবদুল মোতালেব নিহত হন। যিনি এর আগেও একাধিকবার একই এলাকায় অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

গত সোমবার সন্ধ্যায় জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার ও চিহ্নিত সন্ত্রাসী ইয়াছিনকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে র‍্যাব-৭-এর একটি দল অভিযানে যায়। র‍্যাবের উপস্থিতি টের পাওয়ার সাথে সাথে এলাকার মসজিদে বা মাইকে ঘোষণা দিয়ে ৪ শতাধিক মানুষকে জড়ো করা হয়। অপরাধীরা সাধারণ বাসিন্দাদের ভুল বুঝিয়ে র‍্যাবের ওপর লেলিয়ে দেয়।

আগাম ফাঁস অভিযান তথ্য:

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রের দাবি, র‍্যাব জঙ্গল সলিমপুরে পৌঁছানোর আগেই অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়ে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই সন্ত্রাসীরা মাইক ব্যবহার করে স্থানীয় লোকজন জড়ো করে এবং বাহিনীর বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ঘোষণা দেয়।

মানব ঢালের আড়ালে হামলা: ঘন বনাঞ্চল ও সংকীর্ণ পথকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে সামনে রেখে অবস্থান নেয় সন্ত্রাসীরা। র‍্যাব সদস্যরা সেখানে পৌঁছালে সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালায়। এক পর্যায়ে তারা ডিএডি আবদুল মোতালেবের সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় এবং তাকে লক্ষ্য করে গুলী চালায়। এতে র‍্যাব সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে চরম সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েন। এই সুযোগেই আড়াল থেকে হামলা চালানো হয়।

কেন আবদুল মোতালেব ছিলেন টার্গেট:

নিহত আবদুল মোতালেব র‍্যাব-৭-এর গোয়েন্দা টিমের প্রধান ছিলেন। র‍্যাবের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, তিনি জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আগেও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তার নেতৃত্বে সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্যে কয়েকটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক চিহ্নিত হয়। তদন্তে উঠে এসেছে যে, তিনি এই হামলার আগে থেকেই সন্ত্রাসীদের 'টার্গেট' বা লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। ফলে স্থানীয় অপরাধীগোষ্ঠীর কাছে তিনি 'ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকর্তা' হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন।

গোয়েন্দা তৎপরতা: এই এলাকার

সশস্ত্র বাহিনীগুলোর (যেমন- ইয়াসিন বাহিনী, রোকন বাহিনী) কর্মকাণ্ড দমনে গত ৬ মাস ধরে র‍্যাব পরিকল্পনা করছিল। আবদুল মোতালেব সাদা পোশাকে বেশ কয়েকবার সেখানে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।

পূর্ব শনাক্তকরণ

সলিমপুরের প্রবেশপথে সন্ত্রাসীদের নিজস্ব সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। গোয়েন্দা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে সন্ত্রাসীরা চিনে ফেলেছিল। ফলে ১৯ জানুয়ারি যখন তিনি দলবল নিয়ে অভিযানে ঢোকেন, তখন তাকে দেখামাত্রই সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে আঘাত করে।

নৃশংস হত্যাকাণ্ড: তাকে ধরে গহিন

পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রড ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। র‍্যাবের কর্মকর্তাদের মতে, তিনি আগে থেকে ওই এলাকায় কাজ করায় সন্ত্রাসীরা তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছিল।

অপরাধীদের নিরাপদ ঘাঁটি জঙ্গল

সলিমপুর: তদন্তে উঠে এসেছে, পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে মাদক, অবৈধ পাহাড় কাটা ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণকারী চক্রের আস্তানা। ভূ-প্রকৃতিগত সুবিধা এবং স্থানীয় সহযোগিতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

কেন নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হচ্ছে: বিশেষজ্ঞদের

মতে- স্থায়ী আইনশৃঙ্খলা চৌকি না থাকা, অভিযানের পরপরই বাহিনী প্রত্যাহার, প্রভাবশালী মহলের নীরব সমর্থন, এই তিনটি কারণ জঙ্গল সলিমপুরকে বারবার রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে।