তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : সরকারী দফতরে ঘুষ লেনদেনের কারবার ঠেকাতে ফাঁদ অভিযান জোরদার করছে দুর্নীতি বিরোধী রাষ্ট্রীয় একমাত্র সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। বছরের সবকটি কার্যদিবসজুড়ে ঘুষ লেনদেনের কারবার কমবেশি ঘটে থাকলেও উৎসব-পার্বণ কেন্দ্রীক এই লেনদেনের পরিমানটা বেড়ে যায় আর্থিক চাহিদার কারনে। ফলে এ সময়টাতে ফাঁদ অভিযান জোরদার করা হয়। তবে, অভিযোগ বা লেনদেনের কোন তথ্য বা সংবাদ না থাকলে এই অভিযান চালানো দূরহ হয়ে পড়ে। যার কারনে দুদক বরাবরই উৎসাহিত করে থাকে অভিযোগ জানাতে, ঘুষ লেনদেন না করতে। মুখিয়ে থাকা দুদক অভিযোগ পেলেই ফাঁদ পাতে, ঘুষখোর ধরতে অভিযান চালায়।

দুদক সুত্রের দাবী, এই ফাঁদ পেতে ঘুষখোর ধরার অভিযানটা চলমান। অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চলে। অভিযোগ না পেলে অভিযান হয়না। সর্বশেষ গত ১৭ মার্চ সোমবার ফাঁদ পেতে ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. শেরিকুজ্জামান ও অডিট অফিসার মো. হান্নানকে ঘুষের টাকাসহ গ্রেফতার করেছে দুদক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে নিয়মিতভাবেই এ ধরনের ফাঁদ অভিযান পরিচালিত হবে বলে সূত্রের দাবি।

জানা গেছে, সরকারি বিভিন্ন দফতরে অসাধু কর্মকর্তাদের ঘুষ লেনদেন চলে সব সময়ই। তবে ঈদ সামনে রেখে সেই তৎপরতা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এ সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ আসার সংখ্যাও বেড়ে যায় একই হারে। ফলে ঈদ সামনে রেখে হাতেনাতে ঘুষখোর ধরতে ফাঁদ অভিযান জোরদার করেছে দুদক।

হাতেনাতে ঘুষখোর ধরতে ফাঁদ অভিযান পরিচালনায় দুদকের নিষ্ক্রিয়তা বিরাজ করছিল দীর্ঘদিন ধরে। কয়েক মাস পর হঠাৎ এ ধরনের অভিযান চালাতে দেখা গেছে। দুদকের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেফতারে পূর্বানুমতির বিধান এবং অভিযান পরিচালনার জন্য শর্তযুক্ত গাইডলাইনের কারণে ২০২৩ সাল থেকেই ফাঁদ অভিযানে নিষ্ক্রিয়তা শুরু হয়। ফাঁদ অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়ে ২০২৩ সালের মে মাসে নতুন গাইডলাইন জারি করে কমিশন।

এতে বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি চাকরিজীবীকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ও সজ্ঞানে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ফাঁদ অভিযান চালানো যাবে না। এ ক্ষেত্রে যিনি মিথ্যা তথ্য দেবেন, তাকেসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সেই সুযোগে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুষ লেনদেন বেড়েছে। গাইডলাইন জারির পর প্রতিবছর দুটির বেশি অভিযান চালাতে পারেননি দুদক কর্মকর্তারা। তাদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেপ্তারে পূর্বানুমতির বিধান এবং অভিযান পরিচালনার জন্য নতুন গাইডলাইনের কারণে ফাঁদ অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়েছে। তবে অভিযান কখনোই বন্ধ করা হয়নি।

চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও পাসপোর্ট অফিসের সহকারী হিসাবরক্ষক ফারুক আহমেদকেও ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেন দুদক কর্মকর্তারা। এর আগে ২০২৪ ও ২০২৩ সালেও মাত্র দুটি করে অভিযান চালানো হয়।

দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন বলেন, ‘ফাঁদ অভিযান দুদকের একটি চলমান প্রক্রিয়া। বিদ্যমান নীতিমালা এ ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্য পেলে দ্রুততম সময়ে ফাঁদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। কোনো ভুক্তভোগী চাইলে যেকোনো সময় দুদকে এ ধরনের অভিযোগ জানাতে পারেন। টোল ফ্রি হটলাইন ১০৬-এ কল করে যে কেউ অভিযোগ করতে পারেন। এ ছাড়া ঢাকায় দুদকের প্রধান কার্যালয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় অথবা বিভাগীয় কার্যালয়ে সংক্ষুব্ধ সবাই অভিযোগ জানাতে পারেন।’

অভিযোগে প্রকাশ, দুদকের ফাঁদ অভিযান জোরদার না থাকার সুযোগে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। বিশেষ করে পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ, পুলিশ প্রশাসন, সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস, ভূমি হস্তান্তরসংক্রান্ত সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, সমাজসেবা দপ্তর, সমবায় অফিস, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, শিক্ষা অফিস, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, ব্যাংক-বিমা, অডিট ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়সহ দুর্নীতিপ্রবণ অন্তত ১৭টি প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সারা দেশে বিভিন্ন সময়ে দুদকের গণশুনানিতে প্রাপ্ত অভিযোগেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান কমিশনের অধীনে গত ২৯ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জে ৪১টি অভিযোগ এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি ৫৮টি অভিযোগ উত্থাপিত হয়। অধিকাংশ অভিযোগই ঘুষ-দুর্নীতিসংক্রান্ত।

২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দুদকের জারি করা আরেক অফিস আদেশে প্রতিটি বিভাগীয় পরিচালকের উদ্যোগে প্রতি মাসে অন্তত একটি করে ফাঁদ অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী আট বিভাগের কার্যক্রমে প্রতিবছর অন্তত ৯৬টি অভিযান পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল। লক্ষ্য বাস্তবায়ন না হলেও সে সময় প্রতিবছর ১৫ থেকে ১৮টি ফাঁদ অভিযান সফল হতে দেখা গেছে। পরিসংখ্যান অনযায়ী, ২০১৮ সালে ১৫টি, ২০১৯-এ ১৬ এবং ২০২০ সালে ১৮টি অভিযান সফল হয়। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৫৮টি অভিযান সফল হয়।

দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে ২০০৪ সালে দুদক প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ঘুষখোর ধরতে ফাঁদ অভিযান শুরু হয় ২০০৯ সালের ২২ নভেম্বর। এরপর ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও পাঁচটি অভিযান পরিচালিত হয়। তখন এসব অভিযানে পুলিশের সহযোগিতা নেওয়া ছিল অপরিহার্য। ২০১০ সালের ৯ ডিসেম্বর রাজধানীর মিরপুর থানার তৎকালীন এসআই রাকিবকে ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে আটক করা নিয়ে শুরু হয় বিপত্তি। দুদক কর্মকর্তারা এসআই রাকিবকে আটক করে মিরপুর থানাতেই সোপর্দ করেন। কিন্তু থানা কর্তৃপক্ষ তাকে ছেড়ে দেয়। এ নিয়ে দুদক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হয়। এরপর দীর্ঘ দেড় বছর কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি দুদক। অভিযান আবার শুরু করতে ২০১২ সালের মে মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন দুদকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে ডিএমপির ডেপুটি কমিশনার, র‌্যাবের কয়েকজন অধিনায়কসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছিলেন। বৈঠকে ফাঁদ অভিযানে র‌্যাব, পুলিশ ও দুদক একযোগে কাজ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ছয় মাসে পাঁচটি অভিযান সফল করা হয়। ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর র‌্যাব-৩-এর সহযোগিতায় ঘুষের ৫০ হাজার টাকাসহ সহকারী কর কমিশনার (ঢাকা কর অঞ্চল-৫) কাজী আশিকুর রহমানকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।