আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে থেমে নেই কুচক্রী মহলের অপতৎপরতা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘাত সহিংসতার জন্য সীমান্ত দিয়ে দেশে আনা হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ভারতের কলকাতায় অবস্থানরত কয়েকজন পলাতক রাজনৈতিক নেতা ও সন্ত্রাসী এই অস্ত্র পাচারচক্রের নেপথ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে। তাদের নির্দেশনায় দেশের বিভিন্ন সীমান্তে সক্রিয় রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

জানা গেছে, সীমান্ত দিয়ে দেশে আনা এসব আগ্নেয়াস্ত্র চক্রের মাধ্যমে হাতবদল হয়ে ঢাকা- চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধীদের হাতে চলে যাচ্ছে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এবং সীমান্ত পেরিয়ে আসা অস্ত্র নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহার হতে পারে বলে শঙ্কা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, চোরাচালানের রুট বন্ধ না হলে নির্বাচন ঘিরে দেখা দিতে পারে নিরাপত্তাহীনতা। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যা, মুসাব্বির হত্যাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত এক ডজন খুনের ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব হত্যাকা-ে ব্যবহার হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। খুনের পেছনে কখনও রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার কিংবা দখল-বাণিজ্য; কারণ ভিন্ন হলেও অস্ত্র এক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে অধিকাংশই বিদেশী পিস্তল ও রিভলভার।

জানা গেছে, এসব অস্ত্র প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন এলাকায় মজুত করে পরে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। পাচারকাজে সবজি ও ফলের চালান ব্যবহার করা হয়, আর বহনকারীদের বেশিরভাগই কিশোর ও যুবক। পদ্মা নদী ও রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত ঘিরে গড়ে ওঠা এই অস্ত্র চোরাচালান নেটওয়ার্কের সঙ্গে অতীতে রাজশাহী অঞ্চলের আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সংশ্লিষ্টতা ছিল। মামলা ও তদন্তের চাপে তারা ভারতে পালিয়ে গেছেন। সেখান থেকেই তারা বাংলাদেশে থাকা অনুসারী ও সহযোগীদের মাধ্যমে অস্ত্র পাচার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিগত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্থানীয় এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের ছত্রছায়ায় যারা অস্ত্র কারবারে যুক্ত ছিল, তাদের কেউ দেশে ফিরে সক্রিয় হয়েছে, কেউ বিদেশে থেকেই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে, আবার কেউ কারাগারে থেকেও সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

বিজিবির তথ্যানুযায়ী, নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্তবর্তী ২৭ জেলায় অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত ৭৮৭ জন লাইনম্যানের তালিকা করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৩৮ জন, রাজশাহীর তিনজন, জয়পুরহাটে ১৬ জন এবং নওগাঁর ১৯ জন আছে। বাকিরা অন্য এলাকার। তাদের ওপর বিশেষ নজরদারি চলছে। একই সঙ্গে নতুন অস্ত্র কারবারিদের শনাক্তে নিয়মিত তালিকা হালনাগাদ করছে বিজিবি। গত ছয় মাসে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই জব্দ হয়েছে ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪১টি গুলী ও সাড়ে ৯ কেজি বিস্ফোরক। জানুয়ারির শুরুতে শিবগঞ্জের আজমতপুর সীমান্তে আমবাগান থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি ওয়ান শুটারগান। এর আগেও একাধিক দফায় পিস্তল ও গুলী জব্দ হয়েছে। এ ছাড়া গত ডিসেম্বর ও চলতি জানুয়ারিতেও একের পর এক অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। গত ৫ ডিসেম্বর বাঘার জোতকাদিরপুর এলাকায় দুটি ওয়ান শুটারগান ও হেরোইন জব্দ করে র‌্যাব। ১২ জানুয়ারি রাজশাহী নগরীর সিটিহাট এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত কার্যালয়ের পাশ থেকে একটি বিদেশী পিস্তল, দুটি গুলী ও একটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। শুধু তাই নয়, গত বছরের ২৬ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাওয়া বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালিয়ে আটটি বিদেশী পিস্তল, ১৪টি ম্যাগাজিন, ২৬টি গুলী, গানপাউডার ও প্লাস্টিক বিস্ফোরক উদ্ধার করে সেনাবাহিনী। সীমান্ত থেকেই এসব অস্ত্র ঢাকায় নেওয়া হচ্ছিল। এর আগে গত ১৬ আগস্ট রাজশাহীর কাদিরগঞ্জ এলাকার একটি কোচিং সেন্টারে অভিযান চালিয়ে দুটি বিদেশি এয়ারগান, একটি রিভলভার ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। বৃহস্পতিবার বাগমারায় অভিযান চালিয়ে একটি অস্ত্রসহ দুজনকে আটক করে সেনাবাহিনী।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে জানা যায়, দেশে বেশিরভাগ অস্ত্র সীমান্ত দিয়ে ঢুকলেও ঠিক কতগুলো রুট দিয়ে আসছে এসব অস্ত্র- তার সঠিক হিসাব না থাকলেও মূল চ্যানেল রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, নওগাঁ, যশোর, কুষ্টিয়া, সিলেট ও সুন্দরবন। তবে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র ঢোকার তথ্য আসে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে। মিয়ানমার-বাংলাদেশের স্থলসীমানা মূলত নাফ নদী, পাহাড় ও জঙ্গলবেষ্টিত। এসব সীমানার বেশ কয়েকটি পয়েন্ট অরক্ষিত। সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সোর্স থেকে নানা তথ্য পাওয়া যায়। তথ্যানুযায়ী, টেকনাফ থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি পর্যন্ত নজরদারি থাকলেও দেশে ঢুকছে অস্ত্রের চালান। নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একজন বলেন, অস্ত্র ঢুকছে ঈদগড়, বাইশফাঁড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি, ফুলছড়ি, সোনাইছড়ি, বালুছড়ি সীমান্ত দিয়ে। জি-৩, জি-৪ এবং চায়না অস্ত্র মিয়ানমারের বার্মা থেকে রোহিঙ্গাদের হাতে আসে; পরে বিভিন্ন জায়গায় তারা পাচার করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে অন্তত ৪০ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া নেই। মূলত এই ফাঁক দিয়েই অস্ত্র ঢুকছে। সীমান্ত পাহারায় বিজিবির তিনটি ব্যাটালিয়ন থাকলেও কৌশলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে কারবারিরা। আর বিজিবির হাতে যেগুলো ধরা পড়ছে তার বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি নাইন এমএম পিস্তল। রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা ও চারঘাট সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এসব অস্ত্র ভোটের সময় সহিংসতায় ব্যবহারের আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধান বলছে, ভারতের পাশাপাশি মিয়ানমার সীমান্তও হয়ে উঠেছে অস্ত্র চোরাচালানের নীরব করিডোর। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ২৭১ কিলোমিটারের ১৪টি রুট দিয়ে অস্ত্র ঢুকছে বাংলাদেশে; এসব রুটের বেশিরভাগই অরক্ষিত। অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত প্রায় ডজন খানেক গ্রুপ; যাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর। বিজিবির তথ্য বলছে, গত বছরের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে দেশি-বিদেশি মিলে এক হাজার ২০০-এর বেশি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করে সংস্থাটি।

সীমান্তে ১৬০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার বিজিবির: সম্প্রতি মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও জব্দ হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, সীমান্তে গত এক বছরে ১৬০টি বিভিন্ন ধরনের অবৈধ অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ্ধ উদ্ধার করা হয়েচে। এ সময় বিজিবির নিয়মিত অভিযানে ১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকারও বেশি বিভিন্ন ধরনের চোরাচালান পণ্য উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি ভারত ও মিয়ানমারের সাড়ে ৭ হাজার নাগরিককে বাংলাদেশ অবৈধভাবে প্রবেশের সময় আটক করেছে বিজিবি। গতকাল সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে গত বছরের জানুযারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সীমান্তে তাদের কর্মকা-ের এই চিত্র তুলে ধরেছে বিজিবি। ভারত ও মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে দেশে আসা অস্ত্রের মধ্যে ছিল ৬৪টি পিস্তল, ২টি এসএমজি, ১৯টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ১০টি রাইফেল, ৩টি রিভলবার, ৫৬টি বিভিন্ন প্রকার গান, ১,৫০৯টি গোলাবারুদ, ৫৭টি ম্যাগাজিন, ৮টি মর্টার শেল, ৭৩,১০০টি সিসার গুলী, ২০.০৫ কেজি গানপাউডার, ৪টি মাইন, ৭৯টি হাতবোমা, ৪০টি পেট্রোলবোমা, ১৭৮টি ককটেল এবং ২৫টি অন্যান্য অস্ত্র।

গাইবান্ধায় অস্ত্রসহ বিএনপি নেতা গ্রেফতার: গাইবান্ধার ফুলছড়িতে অভিযান চালিয়ে গত বৃহস্পতিবার (৩০ জানুয়ারি) দেশীয় অস্ত্রসহ মো. মিলন মিয়া (৪৪) নামে এক বিএনপি নেতাকে গ্রেফতার করেছে যৌথ বাহিনী। গ্রেফতার মো. মিলন মিয়া ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ রসুলপুর গ্রামের মৃত মেছের উদ্দিন সরকারের ছেলে এবং কঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি। জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যৌথবাহিনী অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় মো. মিলন মিয়াকে তার নিজ বসতবাড়ি থেকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কয়েকটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ফুলছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুরুল হুদা জানান, অভিযানে দেশীয় অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।

ফরিদপুরে অস্ত্রসহ যুবদল নেতা গ্রেপ্তার: ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে অস্ত্রসহ মাহবুবুর রহমান সজিব নামে যুবদলের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাতে উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ময়েনদিয়া গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও দুটি গুলী উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার মাহবুবুর বোয়ালমারী উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রয়েছেন।