• পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ হওয়ার আশা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
  • মামলা শিশু সহিংসতা ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর

রাজধানীর পল্লবীতে আটবছর বয়সি শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আসামী সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি হবে আগামী ১ জুন। গতকাল রোববার বিকেলে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে ঢাকা মহানগরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন শুনানির এ দিন ধার্য করেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান এদিন দুপুরে দুই আসামীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।

তিনি বলেন, সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ এবং স্বপ্নার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর মৃত্যুর সহায়তার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। মামলায় ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এরপর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্রটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে বদলির আদেশ দেন। এ দিন সোহেল রানা ও স্বপ্নাকেও কড়া পাহারায় আদালতে হাজির করা করা হয়। তবে তাদের এজলাসে তোলা হয়নি।

এদিকে, মামলাটি দ্রুত বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঢাকার শিশু সহিংসতা ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়েছে। আদালতে ৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেয়ার পর মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে শিশু সহিংসতা ট্রাইব্যুনালে বদলি করা হয়। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রধান আসামী সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার চার্জশিটে ১৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।

এর আগে সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সকালে ‘চাঞ্চল্যকর’ এ মামলার বিচার নিয়ে সচিবালয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম-বিএসআরএফ আয়োজিত সংলাপ অনুষ্ঠানে বলেন, রামিসা হত্যার ঘটনায় আসামীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে যা যা করা প্রয়োজন তা করা হচ্ছে। এই মামলার বিচারকাজ পাঁচ–সাত দিনের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এই অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে যা যা করা দরকার, সরকার তাÑই করবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই হত্যাকা-ের ঘটনায় আসামীকে সাত ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এক দিনের মধ্যে। সেই ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে সহযোগী হিসেবে তাঁর স্ত্রীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার খুব দ্রুততার সঙ্গে আদালতের অনুমতি নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছে। সেই পরীক্ষায় তিন দিন সময় লাগে। তিন দিনের মধ্যে সেটি শেষ হয়েছে। প্রতিবেদন গতকাল শনিবার বিকেলে জমা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন চলে এসেছে। এগুলো সব একসঙ্গে করে অভিযোগপত্র প্রণয়নের কাজ শনিবার রাতের মধ্যে শেষ হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এই মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য বিশেষ পিপি (সরকারি কৌঁসুলি) নিয়োগ করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সবকিছু বিবেচনায় আমরা আশা করছি যে খুব সম্ভবত পাঁচÑসাত দিনের মধ্যে এই বিচারকাজ শেষ হবে।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতেন। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামীরা কৌশলে তাকে ভবনের তৃতীয় তলায় তাদের রুমে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে আসামীদের রুমের সামনে মেয়েটির স্যান্ডেল দেখতে পায় তার মা। এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এ সময় সোহেল ও স্বপ্নার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পায়। স্বপ্না সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন।

জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেছেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেন সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে লাশ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান। এদিকে আসামীপক্ষে ঢাকা আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্য আইনি সেবা দিবে না মর্মে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনায় আইনজীবী হিসেবে আজিজুর রহমান দুলুকে শনিবার বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ বলেছে, ওইদিন সকালে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর ফ্ল্যাটের সাবলেট এই ভাড়াটে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিলেন। পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুইজনকে আসামী করে সেদিনই পল্লবী থানায় মামলা করেন।

বিচার দ্রুত শেষ করতে বিশেষ বেঞ্চ প্রয়োজন : শিশু রামিসার মতো চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে হাইকোর্ট বিভাগে বিশেষ বেঞ্চ গঠন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন।

গতকাল রোববার দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।

মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, শিশু রামিসার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নৃশংস, নির্লজ্জ, ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য আজ গোটা জাতি অসম্মানিত। আইনজীবী হিসেবে আমাদের হৃদয়েও রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা হলো, এ ধরনের মামলার বিচারকাজ বছরের পর বছর পার হলেও শেষ হয় না। তাই দ্রুত বিচারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। দ্রুত বিচার কোনো বেআইনি নয়। বরং দীর্ঘসূত্রতাকে খারাপ মনে করেন মানুষ।

চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের মামলার বিশাল জট কমাতে উচ্চ আদালতে অবিলম্বে বিচারক নিয়োগ, মিথ্যা মামলা বন্ধ এবং হয়রানির শিকার নির্দোষ ব্যক্তিদের জন্য ‘ক্ষতিপূরণ বোর্ড’ গঠন করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে দ্রুত বিচার নিশ্চিতে পুলিশি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে হবে।

নিম্ন আদালতে সাজা হওয়ার পর উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, কারও কোনো সাজা হলে আপিল বিভাগে আসার পর সেই শুনানি হতে কত বছর লাগবে, কেউ জানেন না। এজন্য সরকারের আশ্বাসেও মানুষ এখন আর বিশ্বাস করছে না। তাই নারী ও শিশু নির্যাতনসহ স্পর্শকাতর ঘটনাগুলো নিয়ে বিশেষ বেঞ্চ তৈরি করতে হবে। তাহলেই তাড়াতাড়ি আপিল নিষ্পত্তি হবে।

উচ্চ আদালতে বিচারক সংকটের কথা তুলে ধরে মাহবুব উদ্দিন বলেন, বিচারকের স্বল্পতার কারণে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ অনেকটা স্থবির হয়ে গেছে। আগে আপিল বিভাগে তিনটি বেঞ্চ থাকলেও এখন মাত্র একটি বেঞ্চ দিয়ে কাজ চলছে। হাইকোর্টে কারও জামিন হলে এবং চেম্বার জজ তা স্থগিত করলে সাত-আট বছর ধরে সেটার আর শুনানি হচ্ছে না। এ কারণে মানুষের বিচার পেতে দেরি হলে তা দুর্নীতির জন্ম দেয়। তাই কমপক্ষে দুটি বা তিনটি বেঞ্চ যেন করা যায়, সেজন্য আপিল বিভাগকে দ্রুত বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে।