রাজধানীর ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দখল ছেড়ে দিতে ৮ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সেই আল্টিমেটামের শেষ হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। আজ বুধবার থেকে শুরু হচ্ছে ঢাকা শহরের ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত করার যৌথ অভিযান। এ অভিযানে পুলিশের নেতৃত্বে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেটদের মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরিচালনার সাথে থাকবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনও। সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশ সুত্রে এ খবর জানা গেছে।
জানতে চাইলে ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) মো: তালেবুর রহমান গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, ঢাকা শহর জুড়েই স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কাজটি আজ বুধবার থেকে শুরু হচ্ছে। অবৈধভাবে দখল করা রাস্তা ও ফুটপাত মুক্ত করা পর্যন্ত এই মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হবে।
এর আগে গত ২৩ মার্চ সোমবার ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা শহরের ফুটপাত ও সড়ক দখল করে পরিচালিত দোকান, রেস্তোরাঁ, ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্ধিতাংশ দ্রুত অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় আজ ১ এপ্রিল থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়। গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব সীমানার বাইরে ফুটপাত ও সড়কের অংশ দখল করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতে পথচারীদের চলাচলে মারাত্মক বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। রেস্তোরাঁর রান্নার সরঞ্জাম, গ্রিল, কাবাব মেশিন, মোটর ওয়ার্কশপের টায়ার, যন্ত্রপাতি, ওয়েল্ডিং-সামগ্রী, পোশাক ও আসবাবের দোকানের প্রদর্শনী সামগ্রীসহ বিভিন্ন মালামাল ফুটপাত ও রাস্তায় রাখা হচ্ছে। এমনকি অনেক মোটরগাড়ির ওয়ার্কশপ রাস্তার এক লেন দখল করে মেরামতের কাজ পরিচালনা করছে। এসব অবৈধ দখলের কারণে পথচারীরা বাধ্য হয়ে সড়কে চলাচল করছে, যা যানজট বৃদ্ধির পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব পরিস্থিতিতে সব ব্যবসায়ীকে দ্রুত ফুটপাত ও রাস্তা থেকে তাদের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। নির্দেশনা অমান্য করলে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কারাদ-, অর্থদ-, মালামাল জব্দসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিএমপির পক্ষ থেকে জনস্বার্থে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে নগরবাসী ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
এদিকে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকেও রাজধানীর ফুটপাত ও সড়ক বেদখলমুক্ত করতে পুলিশের পাশাপাশি নিজস্ব কতিপয় উদ্যোগও নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত রোববার ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন মিরপুর ১০ হোপমার্কেট থেকে মিরপুর ১ কাঁচাবাজার পর্যন্ত ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্দেশ্যে ডিএনসিসি প্রশাসক মোঃ শফিকুল ইসলাম খান ফুটপাতের ওপর নির্মিত অবৈধ স্থাপনা যাচাই করেন। এ সময় উচ্ছেদ উপযোগী স্থাপনা চিহ্নিত করা হয় বলে ডিএনসিসির জনসংযোগ শাখা সুত্রে জানানো হয়। পর্যায়ক্রমে ঢাকা উত্তর সিটির সকল ফুটপাত পরিদর্শন শেষে উচ্ছেদে নামবে ডিএনসিসি।
এর আগে, ফুটপাত দখলমুক্ত করতে নাগরিকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় ডিএনসিসি। কোন কোন এলাকায় ফুটপাত দখল হয়ে আছে এবং কোথায় উচ্ছেদ অভিযান জরুরি সেসব জানতে জনগণের অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগে অংশ হিসেবে গত ২৪ মার্চ মঙ্গলবার ডিএনসিসির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টের মাধ্যমে আহ্বান জানানো হয়। এতে নাগরিকদের নিজ নিজ এলাকার ফুটপাত দখলের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে বলা হয়।
ডিএনসিসি সূত্র জানায়, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে একটি তালিকা তৈরির কাজ চলছে। সেই তালিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা তাদের এলাকার নির্দিষ্ট স্থান উল্লেখ করে ফুটপাত দখলের অভিযোগ জানিয়েছেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন বলে সুত্রের দাবী। সুত্র জানায়, নাগরিকদের দেওয়া এসব তথ্য গুরুত্ব সহকারে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং দখলমুক্ত কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ফুটপাত দখল সমস্যার সমাধানে ডিএনসিসি এবার সরাসরি জনসম্পৃক্ততার পথেই এগোতে চাইছে বলে সুত্রে প্রকাশ।
এদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও হকারদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে পরিকল্পিত ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে। সম্প্রতি মিরপুর রোডে নিউমার্কেট এলাকায় ডিএসসিসি’র নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত আধুনিক ফুটওভার ব্রিজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা শেখ রাসেল রহমান গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক সংগ্রামকে জানান, আগামী সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও হকারদের সাথে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এজন্য নগর ভবনে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে একটি বৈঠক করবেন প্রশাসক। এরপর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, কোন উপায়ে কোন পক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই বেদখল হওয়া ফুটপাত মুক্ত করা যায়। তার সাথে সড়কের ওপরে অবৈধ পার্কিং-স্থাপনা অপসারনেরও উদ্যোগ নেয়া হবে বলে তিনি জানান। শেখ রাসেল জানান, ঢাকা দক্ষিনে চলাচলের উপযোগী রাস্তা রয়েছে ১৬৫৬.৩৭ কিলোমিটার, এরমধ্যে ফুটপাত ২৩১.৪৮ কিলোমিটার। কতটুকু ফুটপাত বেদখল হয়ে আছে, এর কোন সঠিক পরিসংখ্যান ডিএসসিসির হাতে নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিভিন্ন গবেষণা, জরিপ ও বুয়েটের তথ্য বলছে, রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশ ফুটপাতই বেদখলে। এসব ফুটপাতের বেশিরভাগই ব্যবহার হচ্ছে ব্যবসার কাজে। এছাড়া নির্মাণ সামগ্রী বা অবৈধ পার্কিংয়ের দখলেও আছে বেশ কিছু ফুটপাত ও সড়ক। এতে শহরের ৩৮ শতাংশ মানুষ বাধ্য হয়ে মূল রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে। আর সড়কের ২৬ শতাংশ দুর্ঘটনাই যার প্রধান উৎস।
জানা গেছে, এসব ফুটপাতের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকার সিন্ডিকেটের দখলে । আর তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা কর্মীরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এসব ফুটপাত থেকে দৈনিক চাঁদা উঠলেও এখন উঠছে মাসিক কিস্তিতে। প্রতি মাসে যার পরিমাণ শতকোটিরও বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফুটপাত দখলের পেছনে সব থেকে বড় শক্তি ক্ষমতার রাজনীতি। প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তারাও আছেন এর সঙ্গে। তাই ফুটপাতের প্রকৃত হকারদের তালিকা করে পুনবার্বাসন কিংবা সরকারি সুবিধার আওতায় আনাসহ দখলদারদের আনতে হবে আইনের আওতায়।
ডিটিসিএর ‘এসটিপি ২০২৫’ খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় বর্তমানে ১ হাজার ৮৪০ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে। এর ১০ শতাংশের প্রশস্ততা ০.৫ মিটার বা তার কম। ৩৯.৪ শতাংশের প্রশস্ততা এক মিটারের কম, এবং ১৭.৪ শতাংশের প্রশস্ততা ১.৫ মিটারের কম। আদর্শ মান বা দুই মিটারের বেশি ফুটপাতের পরিমাণ মাত্র ৩৩ শতাংশ। এছাড়া ঢাকার ১৬৩টি ফুটপাতের অন্তত ১০৮ কিলোমিটার অংশ অবৈধ দখলের কবলে আছে। এসব দখলে স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও পুলিশের অংশগ্রহণ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।