ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে পুরো ক্যাম্পাস সরগরম। ২৬ আগস্ট চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর থেকেই প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করেন। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল শনিবারও ক্যাম্পাস ছিল প্রার্থী এবং ভোটারদের পদচারণায় মূখর। এবারের নির্বাচনে ২৮টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ৪৭১ জন। এর মধ্যে নারী রয়েছেন ৬২ জন। ভোট গ্রহণ হবে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। হলগুলোর বাইরে নির্ধারিত আটটি কেন্দ্রে ভোট হবে। দীর্ঘ ছয় বছর পর ডাকসুর ভোট ফিরছে, তাই শিক্ষার্থীদের আগ্রহ এবার আকাশচুম্বী। টিএসসি, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, বিভিন্ন অনুষদ ও ইনস্টিটিউট সব জায়গাতেই লিফলেট বিতরণ, ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন, কুশলাদি বিনিময় আর সোশ্যাল মিডিয়া লাইভে সরব হয়ে উঠেছেন প্রার্থীরা।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ এবারের নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ ২৮ সদস্যের প্যানেল দিয়েছে। তারা প্রচারণায় মূলত নৈতিক ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতির কথা বলছেন। টিউশন ফি স্থিতিশীল রাখা, ক্যাম্পাসে সহিংসতা রোধ, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার প্রতিশ্রুতি তাদের। প্রচারণার ধরনেও শিবির বরাবরের মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সংগঠিত। শিক্ষার্থীদের সাথে সরাসরি আলাপচারিতা এবং নিয়মিত মতবিনিময়ের মাধ্যমে তারা নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও শিক্ষার সুযোগসুবিধা বাড়ানোর দিকেই তাদের প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ছাত্রদল এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি হল কভারেজ নিশ্চিত করতে পেরেছে বলে দাবি করছে। ১৮টি হলের মধ্যে ১৪টিতে তারা পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে সক্ষম হয়েছে। প্রচারণায় তারা ‘প্রতিশ্রুতি নয়, পরিবর্তনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ’ স্লোগান দিচ্ছে। আবাসন সঙ্কট নিরসন, ছাত্রাবাস ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহনের রুট সম্প্রসারণ, গবেষণার জন্য আলাদা অনুদান, এসব দাবি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করেছে। তারা হলভিত্তিক দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যাতে ভোটের দিন সংগঠিতভাবে ছাত্রদের ভোট আদায় সম্ভব হয়।
বাম গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটও পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে। ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ নাম দেয়া প্যানেলের ভিপি পদে শেখ তাসনিম আফরোজ (ইমি), জিএস পদে মেঘমল্লার বসু এবং এজিএস পদে জাবির আহমেদ জুবেলকে নিয়ে তারা মাঠে নেমেছে। তাদের প্রচারণার মূল বিষয় হচ্ছে ক্যান্টিনে ভর্তুকি, হলের সিট বণ্টনে স্বচ্ছতা, গবেষণা ও কল্যাণ তহবিল গঠন এবং ক্যাম্পাসে নারীর নিরাপত্তা। তারা মনে করছেন, বাম জোটের এজেন্ডা ইস্যুভিত্তিক এবং বাস্তবসম্মত, যা ভোটে তাদের এগিয়ে দিতে পারে। তারা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় লিফলেট বিতরণ ও অনলাইন কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) এবারের নির্বাচনে ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ নামে প্যানেল দিয়েছে। ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আব্দুল কাদের, জিএস পদে আবু বাকের মজুমদার এবং এজিএস পদে আশরেফা খাতুন। তাদের প্রচারণায় অন্যতম আকর্ষণ হলো এক পাতার নীতিপত্র বিলি, যেখানে ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা সমাধানে ধাপে ধাপে পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ইস্যুভিত্তিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের টকশোতে অংশগ্রহণ, শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিশ্রুতি জানান দিচ্ছেন। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তাদের বেশ কিছু কল্যাণমূলক কাজ রয়েছে, যেগুলো তাদের ভোটব্যাংক বাড়াতে সাহায্য করবে।
অন্যদিকে ছাত্র অধিকার পরিষদ ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ স্লোগান নিয়ে প্রচার শুরু করেছে। তারা ভোটারদের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত সংস্কার, হলে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নারীশিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গবেষণায় বৃত্তি বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া পাশাপাশি তারাও রুমে রুমে গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ‘সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ’ নামে প্যানেল ঘোষণা করেছে। ভিপি পদে ইয়াসিন আরাফাত, জিএস পদে খায়রুল আহসান মারজান এবং এজিএস পদে সাইফ মোহাম্মদ আলাউদ্দিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের প্রচারণা মূলত নৈতিক শিক্ষাঙ্গন এবং সার্বজনীন সহায়তা তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতিতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। তারা সংবাদ সম্মেলন, ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজেদের প্রচারণা চালাচ্ছে।
পাশাপাশি রয়েছে বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র প্যানেল ও স্বাধীন প্রার্থী। ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্যজোট’ সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা শিক্ষার্থীদের বোঝাতে চাইছে যে, দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে ব্যক্তিকে ভোট দিলে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে। তাদের প্রচারণার প্রতিশ্রুতিতে ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা, ডিজিটাল সার্ভিস ডেস্ক, গবেষণা সহায়তা এবং কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রচারযুদ্ধ যত তীব্র হচ্ছে, ততই ক্যাম্পাসের পরিবেশ উৎসবমুখর হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, ২০১৯ সালের ছয় বছর পর ডাকসুর ভোট হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর গণতান্ত্রিক এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পেরে তারা রোমাঞ্চিত। চায়ের টেবিলে, ক্যান্টিনে, ক্লাসরুমে সর্বত্র চলছে প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা। অনেক হলে মক ভোট হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা মজা করে ভোট দিচ্ছেন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে।
তবে প্রচার চললেও আচরণবিধি মানা নিয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কড়া নজরদারি। নির্ধারিত স্থানের বাইরে কোনো পোস্টার বা ব্যানার টাঙাতে দেয়া হচ্ছে না। ইতোমধ্যেই টাস্কফোর্স বেশ কিছু ব্যানার সরিয়ে ফেলেছে। প্রার্থীরা বাধ্য হয়ে এখন বিভাগভিত্তিক সভা ও অনলাইন প্রচারণার ওপর নির্ভর করছেন।
গত ২৬ আগস্ট থেকে শুরু হয় ডাকসু নির্বাচনের প্রচারণা। প্রার্থীদের সাদা-কালো পোস্টার-ফেস্টুনে সয়লাব হয়ে গেছে ঢাবি ক্যাম্পাস। এর মধ্যে ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট ও উমামা ফাতেমার নেতৃত্বাধীন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী জোটের ব্যানার দেখা মেলে সবচেয়ে বেশি। যদিও আচরণবিধিতে ক্যাম্পাসের কোনো বিল্ডিং গাছ কিংবা অন্য স্থাপনায় পোস্টার, ব্যানার লাগানো যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব ব্যানার নিজস্ব খুঁটি ও কাঠামোতে ক্যাম্পাসের সর্বত্র দেখতে পাওয়া যায় । যাকে আচরণবিধির লঙ্ঘন নয় বলে মনে করেন প্রার্থীরা। তবে ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করেছে প্রশাসন। গত ২৬ আগস্ট দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গঠিত টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে ব্যানার-ফেস্টুন অপসারণ করা হয়। টিএসসি ও বিভিন্ন হল গেটে থাকা ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ ও ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’সহ অন্যান্য প্যানেলের ব্যানার-ফেস্টুন প্রক্টরিয়াল টিমের গাড়িতে তুলে অপসারণ করা হয়।
এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো: জসীম উদ্দিন বলেন, আচরণবিধিতে ফেস্টুন লাগানোর বিষয়ে একটু ভুল বুঝাবুঝি ছিল। ফলে অনেকে ফেস্টুন বানিয়ে বিভিন্ন জায়গায় টানায়। তবে আমরা সবাইকে জানিয়েছি, নিজেদের ব্যানার-ফেস্টুন তুলে নিতে। তারা না সরালে প্রক্টরিয়াল টিমের সহায়তায় আমাদের টাস্কফোর্সের টিম তা সরিয়ে ফেলে।
আচরণবিধি লঙ্ঘন : নির্বাচনের আচরণবিধি ভঙ্গ করে রাত এগারোটার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদল মনোনীত ডাকসু সহসভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থী আবিদুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে। বিধি অনুযায়ী একজন প্রার্থী রাত ১১টার পরে কোনো ধরনের প্রচারণা চালাতে পারবেন না। কিন্তু বুধবার রাত ১২টার পরও শেখ মুজিবুর রহমান হলে প্রচারণা চালাতে দেখা যায় আবিদুলকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনদিন ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকবে। গতকাল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর রোববার থেকে ১০ সেপ্টেম্বর বুধবার পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকবে।