ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত ‘জুলাই সনদ ও সংস্কার: শহীদ পরিবারের আকাঙ্খা’ শীর্ষক সংস্কার আলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (৮ এপ্রিল ২০২৬) বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) প্রাঙ্গণে এ সংস্কার আলাপের প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে জুলাই-আগস্টে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।
স্বাগতে বক্তব্যে ডাকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক এম এম আল মিনহাজ বলেন, ‘জুলাই সনদের পক্ষে গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও সরকার যদি তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করে এবং সংবিধানের দোহাই দিয়ে পুরোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় ফিরতে চায়, তা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। অতীতের নিপীড়নের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও যদি একই ধারা পুনরায় চালু হয়; গুম, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ফিরে আসে; তাহলে তা জনগণের প্রত্যাশার সরাসরি বিরোধী আচরণ। তাই সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে গৃহীত জুলাই সনদ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছি, অন্যথায় জনগণই এর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য মো. বেলাল হোসাইন অপু বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের রক্তঝরা আত্মত্যাগের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই বাস্তবতায় জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেট উপেক্ষা করে কোনো ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন গ্রহণযোগ্য নয়—এটি জনগণ মাঠে থেকেই জবাব দেবে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে পুরোনো ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে; শেখ হাসিনার মতো পরিণতি গ্রহণ করতে হবে। তাই শহীদ পরিবার ও আহতদের আর্তনাদ শোনার আহ্বান জানাচ্ছি।
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য রাইসুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন সরকার পূর্ববর্তী সরকারের পথ অনুসরণ করছে, যা দেখে মনে হচ্ছে আবারও তরুণ সমাজকে রাজপথে নামতে হতে পারে। বিচারব্যবস্থা নিয়ে অতীতে যেসব অভিযোগ ছিল, সেগুলো পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—যা একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথে বড় বাধা। তাই অতীতের নির্যাতনের শিকার হয়ে আবার নতুন করে জুলুম না করে, শহীদদের আত্মত্যাগ ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সত্যিকারের পরিবর্তন আনুন।’
ডাকসুর ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘গণভোটে প্রাপ্ত প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণের রায় উপেক্ষা করে কোনো দল রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে না, করলে জনগণই তার জবাব দেবে। সরকার যদি জনগণের ম্যান্ডেট অগ্রাহ্য করে একক ক্ষমতায় নিয়োগ ও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায় এবং পূর্বের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে, তবে তা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার লক্ষণ বলে আমি মনে করি। তাই গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছ নিয়োগ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি, অন্যথায় জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের বিশাল আত্মত্যাগের পরও প্রত্যাশিত সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়ায় গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে, কারণ দায়িত্বপ্রাপ্তরা তা আন্তরিকভাবে পালন না করে ক্ষমতা ভোগের পথে হাঁটছেন। এখনও সময় আছে সংস্কার বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে এবং ভুল সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার পথে ফিরতে হবে।’
জুলাই বিপ্লবী পরিষদের সদস্য সচিব সাদিল আহমেদ বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১৪০০ শহীদ জীবন দিয়েছেন ফ্যাসিবাদ দূর করে বাংলাদেশে মৌলিক পরিবর্তন আনার জন্য, শুধুমাত্র চেয়ারের পরিবর্তনের জন্য নয়। শহীদদের পরিবার এবং সহযোদ্ধারা এখনও জীবিত, তারা এই স্বপ্নের জন্য রাজপথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ভুলে যাবেন না। বর্তমান শাসনব্যবস্থা যদি বিদ্যমান অবিচার বজায় রাখে, তাহলে জনগণ এবং শহীদ পরিবারের সমর্থকরা আবারো শক্তভাবে আন্দোলনে নামবেন।’
জুলাই শহীদ ইব্রাহীমের মা বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার আমার ছেলে শহীদ হয়। আমার কোন দুঃখ নাই। শুধু একটাই চাওয়া ইব্রাহীমকে যেন আল্লাহ যেন শহীদ হিসেবে কবুল করেন। আর সরকারের কাছে একটাই দাবি, বাংলাদেশের মানুষ যাতে আর কোনদিন আমাদের মত দুঃখিনী তার সন্তান না হারায়। পুরনো ব্যবস্থা যেন আর ফিরে না আসে।’
জুলাইয়ে শহীদ জিসানের মা বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে ২০শে জুলাই আন্দোলনে গিয়ে ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে শহীদ হয়েছে, আর তার স্ত্রীও স্বামীর শোক সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুবরণ করেছে, আমি মা হয়ে দুই সন্তানের শোকে ভেঙে পড়েছি, তবুও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে আমার ছেলে শাহাদাত পেয়েছে। আমার কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া নেই, সরকারের কাছে আমার আহ্বান; জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করুন, নইলে জনগণ আবার রাজপথে নামবে; আমার এক ছেলে শহীদ হয়েছে, প্রয়োজন হলে আমিও সেই পথে প্রস্তুত আছি।’
শহীদ দ্বীন ইসলামের পিতা বলেন, ‘আমার ছেলে ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে শহীদ হয়েছে। আমিও সেখানে ছিলাম, আমি নিজ চোখে তার সাহসিকতা দেখেছি। আমরা যে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করেছি, সেই লক্ষ্যেই গণভোটে অংশ নিয়ে জুলাই সনদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছি এবং তার বাস্তবায়নই এখন আমাদের প্রধান দাবি। সরকারের কাছে আহ্বান—গড়িমসি না করে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করুন; প্রয়োজন হলে আমরা আবারও রক্ত দিতে প্রস্তুত, আরেকটি জুলাইয়ের জন্যও প্রস্তুত আছি।’
শহীদ রাকিবের ভাই বলেন, ‘আমার ভাই ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে শহীদ হয়েছে—একটি গুলিতেই তার জীবন শেষ হয়ে যায়, যা আমাদের পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। বর্তমান সরকার গণভোটে জনগণের সমর্থনে গৃহীত জুলাই সনদের পক্ষে আগে অবস্থান নিয়ে এখন তার বিপক্ষে যাওয়ার কারণ কী—এ ব্যাপারে আমরা সরকারের কাছে স্পষ্ট জবাব চাই।’
শহীদ সোহেল রানার ভাই বলেন, ‘আমার ভাই ১৮ জুলাই আন্দোলনে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৪ দিন পরে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে তার কবর শনাক্ত করেছি—পুলিশ তাকে হত্যা করে গোপনে দাফন করেছিল। এখনও অনেক শহীদের কবর শনাক্ত হয়নি, অসংখ্য পরিবার বিচার ও সত্যের জন্য ঘুরছে। এমন পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন ও ন্যায়বিচার এখনো নিশ্চিত হয়নি। তাই সরকারের কাছে আহ্বান—শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি না করে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সঠিক তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করুন, নইলে এর দায় এড়ানো সম্ভব হবে না।’
জুলাইয়ে শহীদ হাসানের পিতা মনির হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলে হাসান ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন এবং ছয় মাস ১৩ দিনের পর ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে তার লাশ শনাক্ত হয়। শহীদ সন্তানদের আত্মত্যাগের মূল্য অনুযায়ী বিচার ও সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি, বহু পরিবার আজও তাদের সন্তানকে খুঁজে পায়নি। শহীদদের সম্মানে জুলাই সনদ দ্রুত বাস্তবায়ন করুন এবং গণভোটের ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বাস্তবায়ন করুন।’
সভাপতির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু কর্তৃক আয়োজিত “জুলাই সনদ ও সংস্কার: শহীদ পরিবারের আকাঙ্ক্ষা” অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে সালাম জানাই। আজ আমরা সেই শহীদদের স্মরণ করছি, যারা আত্মত্যাগ করে আমাদের নতুন বাংলাদেশ এবং স্বাধীনতা উপহার দিয়েছে। ২ হাজারের বেশি শহীদ হয়েছেন এবং ৪০ হাজারের অধিক আহত হয়েছে। তাদের স্বপ্ন ছিল একটি নতুন, ন্যায়, ইনসাফ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া। কিন্তু আমরা দেখছি, বিপ্লব পরবর্তী নির্বাচিত সরকার শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ও জাতির সংস্কারের দাবি উপেক্ষা করছে। গণভোট, মানবাধিকার কমিশন, সাংবিধানিক ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অধ্যাদেশগুলো বাতিলের প্রস্তাব এসেছে। ১৬ বছর ধরে তৈরি ফেসিবাদী কাঠামো পুনরায় ফিরে আসার হুমকি দেখা দিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বলছি, স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা আর ফ্যাসিবাদি কাঠামোতে ফিরে যেতে দেব না। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায়কে সার্থক করা হবে। শহীদদের আকাঙ্ক্ষা, গাজী ভাইবোনদের কষ্ট এবং শহীদ পরিবারের প্রত্যাশার প্রতি আমরা দায়বদ্ধ। প্রয়োজনে আমরা জীবন দিতে প্রস্তুত, কিন্তু জুলাই বিপ্লবের আদর্শ বিকৃত হতে দেব না। আমরা দেশের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানাই।’
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য রায়হান উদ্দীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন, কার্যনির্বাহী সদস্য আনাস ইবনে মুনির প্রমুখ।