মো : সামিউল ইসলাম, জবি সংবাদদাতা
গোধূলি বেলায় বিকেলের নরম রোদ গায়ে মেখে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের(জবি) শহীদ মিনারে বৃত্তাকার হয়ে বসে আছে ১০-১৫ জন বন্ধু। বৃত্তের ঠিক মাঝখানে বিছানো পত্রিকা। তাতে ছোলা, মুড়ি, পিঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ,জিলাপি, ধনিয়া পাতা, ঘূর্ণি একসঙ্গে মেশানো। পাশেই পলিথিনে আছে পেয়ারা আর আনারস সবাই অপেক্ষায় রয়েছেন মাগরীবের আজানের। ইফতার সামগ্রী খুব দামী না হলেও এতেই তারা খুশী। পরিমানে খুব অল্প তবুও সবার চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস অনেক বেশি। সারাদিনের ক্লান্তি যেনো হারমেনেছে এক মুহুর্তেই। কষ্ট হলেও সবাই মশগুল আড্ডায় তবে কেউ কেউ ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের শরবত বা অন্য সামগ্রী তৈরিতে। যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রকাশ ঘটেছে বন্ধুত্বের সম্প্রীতির ইফতার।
গতকাল বুধবার পুরান ঢাকায় অবস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের চিত্র এটি। শহীদ মিনার ছাড়াও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া, ভাষাশহীদ রফিক ভবন,নতুন একাডেমিক ভবন,কাঠালতলা, মুক্ত মঞ্চ,সায়েন্স ফ্যাকাল্টিতেও একই চিত্র দেখা যায়।
অন্যান্যবার রোজার শুরুতেই বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়। এবার ক্লাস-পরীক্ষা থাকায় অনেকের ইচ্ছা থাকলেও পরিবারের কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়নি এখনও। ফলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে এখনও প্রানবন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বিকেল গড়াতেই ইফতারের প্রস্তুতি নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গায় জায়গায় জড়ো হতে দেখা যায় বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি-উচ্ছ্বাস একটু বেশিই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী নিঝুম খান। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ক্যাম্পাসে প্রথমবারের মত রোজা পালনের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, জীবনের প্রথম পরিবার ছেড়ে ক্যাম্পাসে রোজা পালন করছি, এটা ভিন্নরকম অনুভূতি। ইফতার আর সেহরিতে পরিবারের সবাই মিলে একটা সুন্দর আয়োজন হতো, এসব মিস করছি। তবে, বন্ধু-বান্ধব ও বড়ভাইদের সাথে ক্যাম্পাসে রোজা রাখছি, ইফতার করছি তাই অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করছে। শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট এর শিক্ষার্থী ফারিহা ইয়াসমিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ শেষ করেছি কিন্তু ক্যাম্পাসে বন্ধুরা সবাই একসাথে ইফতার করার সুযোগ হয় নি ছুটিতে বাড়িতে থাকায়।বন্ধু-বান্ধব এবার সবাই একসাথে ইফতার করতে পারছি। পরিবার ছাড়া একটু কষ্ট হলেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বন্ধুত্বের বন্ধনটা উপভোগ করছি।বন্ধুদের আয়োজন ছাড়াও ক্যাম্পাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক-স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, জেলা ও অঞ্চলভিত্তিক সংগঠন এবং বিভিন্ন বিভাগের পক্ষ থেকে ইফতারের আয়োজন হচ্ছে নিয়মিত। সমাজকর্ম বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী জিসান আহমেদ বলেন, বাড়িতে থাকলে মা বাবার সাথে ইফতার করতে অন্যরকম প্রশান্তি পাওয়া যায়। কিন্তু ক্যাম্পাসেও আমরা বন্ধুদের সাথে আনন্দের সাথে ইফতার করি। ইটপাথরের এই শহরে এটাই অনেক অনন্দের।
ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায় ইফতারে মুসলিম বন্ধুদের সাথে অংশ নেয় সনাতনী ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরাও। এদিন শহীদ মিনারে কথা হয় বর্ষা মুখার্জির সাথে। তিনি বলেন, আমি হিন্দু ধর্মাবলম্বী। কিন্তু আমার বন্ধুরা বেশিরভাগই মুসলিম। ওরা অনেক আনন্দের সাথে ইফতার করে। আমি রোজা থাকি না কিন্তু ওদের বাকি রেখে খাইতেও পারিনা। সারাদিন অল্প কিছু খাইলেও ইফতার করি একসাথে। আমার ভালো লাগে।
আরেক শিক্ষার্থী রুপ বর্মন বলেন, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। বন্ধুরা যেভাবে আনন্দের সাথে ইফতার করে সেটা দেখে মনে হয় এটা উৎসব। এটা দেখতেও ভালো লাগে আবার আমাদের মাঝে সম্প্রতিও বাড়ে। বন্ধুরা দাওয়াত দেয় ইফতারের। আনন্দের সাথেই ইফতার করি আমরা। এদিকে ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে নিয়মিত ইফতারের আয়োজন করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও জকসু। বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে নিয়মিত দুই শতাধিক শিক্ষার্থী এই ইফতারে অংশ নেয়।
জকসুর জিএস আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও জকসুর উদ্যগে নিয়মিত ইফতার করানো হচ্ছে মসজিদে। এটা আমাদের জন্য আনন্দের ব্যাপার। আমরা চেষ্টা করছি ইফতারের মান আরেকটু ভালো করার। আর সবাই যে একসাথে একত্রে ধর্মবর্ণ ভুলে একসাথে ইফতারে সামিল হয় এটা দেখলেই ভালো লাগে।