আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে গুম হওয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দুই মেধাবী শিক্ষার্থী ও শিবির নেতা ওয়ালিউল্লাহ এবং মুকাদ্দাসকে ফেরত চেয়ে মানববন্ধন করেছে শাখা ছাত্রশিবির।

শনিবার (৩০ আগস্ট) বেলা দেড়টায় প্রশাসনিক ভবনের সামনে জড়ো হয়ে এ দাবি জানায় তারা।

আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন শাখা শিবিরের সভাপতি মাহমুদুল হাসান, সেক্রেটারি ইউসুব আলী, গুমের শিকার শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহর বড় ভাই অধ্যক্ষ খালিদ সাইফুল্লাহসহ সংগঠনের শতাধিক নেতাকর্মী।

এসময় তাদের 'আমার ভাই গুম কেন? প্রশাসন জবাব চাই', ‘প্রশাসনের প্রহসন, মানিনা মানবো না’,‘প্রশাসনের টালবাহানা, মানি না মানবো না’, ‘আমার ভাইয়ের খোঁজ, দিতে হবে দিয়ে দাও’, ‘আমার ভাই আয়নাঘরে, প্রশাসন কি করে’, ইত্যাদি শ্লোগানে প্রশাসনিক ভবন চত্ত্বর মুখরিত হয়ে ওঠে।

মানববন্ধনে গুমের শিকার শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহর বড় ভাই অধ্যক্ষ খালিদ সাইফুল্লাহ বলেন, “আমি ওয়ালি-মুকাদ্দাস দুইজনেরই বড় ভাই হিসেবে বলব, আমি যখন ক্যাম্পাসে আসি তখন আমার পা চলে না, কেঁপে উঠে, আমি অস্থির হয়ে উঠি। ক্যাম্পাসে আসার সময় আমি বাবা-মাকে বলে আসতে পারি না যে আমি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছি। আমি ব্যক্তি কষ্ট ভুলে যেতে পারি কিন্তু এই সোনার বাংলাদেশে আমার শত্রু গুম হয়ে যাক তাও আমরা চাই না। কেউ যদি দোষীও হয় পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার বিচার হোক, শাস্তি পাক, কিন্তু এধরনের গুম-হত্যা কখনোই কাম্য নয়। এসব একটি দেশের বড় হওয়া, সমৃদ্ধ হওয়াকে থামিয়ে দেয়।”

গুম হওয়া ভাইয়ের সন্ধান চেয়ে তিনি বলেন, “প্রশাসনকে বলি, আমাদের তাদের খোঁজ দিন। আমার বাবা বারবার বলে, যদি ওরা না থাকে তাহলে তাদের কবর চিনিয়ে দিক, আমরা ওদের কবরটা দেখতে চাই, দোয়া করতে চাই। আমরা জানি না সারাদেশের মানুষ জানে না এরা বেঁচে আছে না চলে গেছে। এদের জন্য দোয়া করতে গেলে আমরা দোয়া করতে পারি না, কারণ আমরা জানি না দোয়াটা কিভাবে করব? আজকের এই মানববন্ধনে আমরা সর্বোচ্চ প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই শুধু ওয়ালি আর মুকাদ্দাস নয়, গুমের শিকার প্রতিটি পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা দাবি জানাই আপনারা তাদের খোঁজ বের করে দিবেন।

জড়িতদের বিচার চেয়ে তিনি আরো বলেন, “আমি এবং মুকাদ্দাসের চাচা গুমের বিষয়ে তদবির করতে মিডিয়া আর প্রশাসনের ঘরে ঘরে গিয়েছিলাম। সে সময় আমরা জানতে পেরেছি, তৎকালীন স্থানীয় প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যোগসাজশেই ওয়ালি-মুকাদ্দাসের গতিবিধি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছিল। দেশের প্রতিটা নাগরিকের বেঁচে থাকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমরা দেশ থেকে ফ্যাসিস্টকে বিতাড়িত করেছি। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া ফ্যাসিবাদের চিহ্ন, তাদের রেখে যাওয়া যে দুষ্টু চক্র এখনো এদেশে রয়েছে, তারা এমন সব কাজ চালিয়ে যাচ্ছে যাতে ন্যায় বিচার ব্যাহত হয়। আমরা চাই এসব দোষীদের কে চিহ্নিত করে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।

১

শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাহমুদুল হাসান বলেন, “আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, আজকে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ পতনের একটি বছর হয়ে গেল। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা ওয়ালিউল্লাহ-মুকাদ্দাস ভাইয়ের সন্ধান পাই নি। সরকার গুম কমিশন তৈরি করলেও সেটার কার্যকরি পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাইনি। আমার মনে হয় এই সরকার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে ফ্যাসিবাদকে আশ্রয় দিচ্ছে। যেটা প্রতীয়মান হয়েছে গতকাল নূরের উপর হামলার মাধ্যমে। আপনারা উপদেষ্টারা যখন ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন, তখন আপনারাও গুমের শিকার হতে পারেন। তাই আপনাদেরকে অনুরোধ সময় থাকতে এর প্রতিবিধান করুন, আমাদের ওয়ালিউল্লাহ-মুকাদ্দাস ভাইয়ের সন্ধান দিন।

তিনি আরও বলেন, তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বে যারা ছিলেন তাদেন ধরুন। আমার মনে হয় তাহলে অনেক কিছু বের হয়ে আসবে । আপনারা কেন ধরছেন না? কেন কুলুপ আঁটা আপনাদের মুখে? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এর দায় এড়াতে পারে না। প্রশাসনকে বলতে চাই, ওয়ালিউল্লাহ -আল মুকাদ্দাস ভাইয়ের ব্যাপারে দ্রুত কথা বলুন। নইলে বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল করে দেওয়া হবে। প্রশাসনে এখনো অনেক ফ্যাসিবাদের দোসর আছে, সরকারকে বলছি প্রশাসনকে ঢেলে সাজান, আর যেন কোনো মা-বাবাকে তাদের সন্তানদেরকে হারাতে না হয়, সে ব্যাপারে এখনি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।”

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মুহাম্মাদ ওয়ালিউল্লাহ এবং আল ফিকহ এন্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আল-মুকাদ্দাস ঢাকা থেকে কুষ্টিয়াগামী ‘হানিফ এন্টারপ্রাইজ’র ৩৭৫০ নম্বর গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন। পথে রাত ১২ টার পরপর আশুলিয়ার নবীনগর গাড়ি থামিয়ে র‍্যাব পরিচয়ে তাদের অপহরণ করা হয়। পরে পুলিশ প্রশাসনিক গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে।

আল-মুকাদ্দাস পিরোজপুর জেলার সদর থানার ২নং কদমতলি ইউনিয়নের খানাকুনিয়ারী গ্রামের সন্তান, তার পিতার নাম মাওলানা আব্দুল হালিম। ওয়ালিউল্লাহ ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার সোলজালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম সোলজালিয়া গ্রামের সন্তান, তার পিতার নাম মাওলানা ফজলুর রহমান। তারা উভয়ই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সদস্য ছিলেন। ওয়ালিউল্লাহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তৎকালীন অর্থ সম্পাদক এবং মুকাদ্দাস সাংস্কৃতিক সম্পাদক দায়িত্বরত ছিলেন। দুইজনই কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের দেশীয় ব্লকের ২১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় তাদের গুম করা হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।