শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন যথাসময়ে বাস্তবায়নের দাবিতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১১টায় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। এতে কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বক্তব্য পেশ করেন।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন— উপস্থিত সাংবাদিক বন্ধুগণ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (শাকসু) নির্বাচন যথাসময়ে বাস্তবায়নের দাবিতে আজকের এই প্রেস ব্রিফিংয়ে আপনাদের আন্তরিক উপস্থিতির জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

আপনারা জানেন, আগামী ২০ জানুয়ারি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ হাজার শিক্ষার্থীর প্রাণের দাবি ‘শাকসু’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিটি প্যানেল ও প্রার্থীরা যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্বারে দ্বজারে যাচ্ছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়েছে এবং প্রশাসন যখন নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে; ঠিক তখনই একটি মহল পেশিশক্তির মাধ্যমে এই নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে পাঁয়তারা করছে।

আপনারা জানেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রতিটি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং সে লক্ষ্যে ক্যাম্পাসে নিয়মিত ও কার্যকর ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা। ছাত্র সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। ক্যাম্পাসে গতানুগতিক ছাত্ররাজনীতির নেতিবাচক ধারা সংস্কার করে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বমূলক ও কল্যাণমুখী নেতৃত্ব বিকাশে ছাত্র সংসদ এক অনন্য ভূমিকা পালন করে।

সম্প্রতি দেশের ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র সংসদের ইতিবাচক ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা থাকার ফলে ওই ক্যাম্পাসগুলোতে আবাসন সংকট নিরসন, পরিবহন সমস্যার সমাধান, মাদক ও বহিরাগত মুক্ত নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, ডাইনিংয়ের খাবারের মানোন্নয়ন এবং একটি স্বাস্থ্যসম্মত ও বাসযোগ্য হলের পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যাপকভিত্তিক কাজ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

এ ছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা, লাইব্রেরির পাঠ-পরিবেশকে আধুনিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব করা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মেধা বিকাশে নানাবিধ ছাত্রকল্যাণমূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা ইতিপূর্বে বাংলাদেশে যতগুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেখানে এমন গঠনমূলক কার্যক্রম দেখা যায়নি। এসব ইতিবাচক ও দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখে প্রতিটি ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ছাত্র সংসদের আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থীরাও তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রতিনিধিত্ব নির্বাচিত করতে এবং ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। তাদের প্রবল দাবির প্রেক্ষিতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ছাত্রদল পরাজয়ের ভয়ে বারবার নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার হীন চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। আপনারা দেখেছেন, এভাবে তারা প্রতিটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধের জন্য অপচেষ্টা চালিয়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের কার্যক্রম প্রভাবমুক্ত রাখতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত ১২ জানুয়ারি থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন পেশাজীবী ও সংগঠনের নির্বাচন আয়োজন না করার নির্দেশ দিলেও শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পূর্বঘোষিত তারিখেই শাকসু নির্বাচন আয়োজনের অনুমোদন দেয় ইসি।

গতকাল থেকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা নির্বাচন বন্ধের দাবিতে ইসি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। অন্যদিকে এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গতকাল নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক দাবিকে উপেক্ষা করে নিজেদের সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ ও লেজুড়বৃত্তির উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই তারা এই জনবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। এটি শুধু শাবিপ্রবি নয়; বরং সারা দেশের শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকারের মূলে কুঠারাঘাতের শামিল।

একদিকে তারা শিক্ষার্থীদের প্রতিটি গণতান্ত্রিক পদক্ষেপে বাধা দিচ্ছে, অন্যদিকে ক্যাম্পাসে আধিপত্যবাদী ও পেশিশক্তি নির্ভর ছাত্ররাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী সাকিব হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসগুলোতে মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাজনীতির কারণে তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে আজ প্রত্যাখ্যাত। নিজেদের পরাজয় ও গ্লানি থেকে শিক্ষা না নিয়ে তারা এখন পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বন্ধের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে দেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘ ১৭ বছর সংগ্রাম করেছে, যে ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন; অথচ আজ ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের সামনে অবস্থান করছে। তাদের কর্মকাণ্ড দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, তারা মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও কার্যত শিক্ষার্থী মতামত ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে তোয়াক্কা করে না। এটি তাদের দ্বিচারিতা এবং ছাত্রসমাজের প্রতি চরম উপহাস। তারা মূলত শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেটকে ভয় পায় বলেই আজ নির্বাচন থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধি আজ নির্বাচন বানচালের জন্য আন্দোলন করছে।

সাংবাদিক বন্ধুগণ, শাকসু নির্বাচন বানচালের এই নীলনকশা নতুন কিছু নয়। নানা নাটকীয়তা ও ৩ দফায় তফসিল পিছিয়ে সর্বশেষ ২০ জানুয়ারি চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী সকল পক্ষ আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে এখন এক উৎসবমুখর পরিবেশ ও নির্বাচনী আমেজ বিরাজ করছে।

এমন পরিস্থিতিতে পেশিশক্তির জোরে কিংবা আদালতকে ব্যবহার করে এই নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা করা হলে শাবিপ্রবির ৯ হাজার শিক্ষার্থীসহ সচেতন ছাত্রসমাজ তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। ইতোমধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই ষড়যন্ত্রকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি আপনারা লক্ষ করেছেন—ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী স্বয়ং তাদের কেন্দ্রীয় সংগঠনের অগণতান্ত্রিক ও নির্বাচনবিরোধী অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচনের পক্ষে নিজের সংহতি প্রকাশ করেছেন।

এটিই প্রমাণ করে যে, এই নির্বাচন বন্ধের দাবি কতটা অযৌক্তিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ইচ্ছার পরিপন্থি। আমাদের দাবি স্পষ্ট—শাকসু নির্বাচন নির্ধারিত তারিখেই অর্থাৎ আগামীকালই সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ, হুমকি কিংবা পেশিশক্তির কাছে নতি স্বীকার করে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটানো হলে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা এবং একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন উপহার দেওয়া।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি ‘শাকসু’ নির্বাচন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে ছাত্রশিবির কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।

এসময় অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, এইচআরএম সম্পাদক সাইদুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক হাফেজ ডা. রেজওয়ানুল হক, কেন্দ্রীয় বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।