ইবরাহীম খলিল, মো. সামিউল ইসলাম : বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা এবং পাল্টাপাল্টি দোষারোপ ও অভিযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে জগন্নাখ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন জগসু নির্বাচন-২০২৫ইং এর ভোট গ্রহণ। এখন অপেক্ষা চূড়ান্ত ফলের। এজন্য সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। গতকাল মঙ্গলবার বিকাল পৌনে ৫টার দিকে ভোট গ্রহণ শেষ হয়। এরপর ৬টার দিকে শুরু হয় ভোট গণনার কাজ। রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটরিয়ামে ভোট গণনা চলছিল। এর আগে সন্ধ্যার দিকে ভোট গ্রহণ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, সারাদিন কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল। তবে সার্বিকভাবে বলতে গেলে সুষ্ঠুভাবেই ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সার্বিক পরিবেশ ভাল ছিল। ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে বলেও জানান তিনি। ভোট গণনা শেষে রাতেই ফলাফল ঘোষণার কথাও জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
এদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে শুরু হয় ভোট গ্রহণ। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সাংবাদিক সম্মেলন করে নিজেদের অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরেন প্রার্থীদের প্যানেল ও শিক্ষক নেতারা। সবশেষ গণমাধ্যমে কথা বলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নেতারা। নির্বাচন শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে অনেক অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছি। যাদের এজেন্টের ভোটার তালিকা আসেনি নির্বাচন কমিশন সেগুলো এনে তাদের দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মাঝে অনেকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। আমরা এসব বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছি। দিন শেষে এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি হয়েছে আমরা তাতে সন্তুষ্ট। নির্বাচন শেষে যে প্রতিনিধি হয়ে আসবে আমরা তাকে অভিনন্দন জানাব।
তীব্র শীতের কারণে এদিন সকালে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বিকাল বেলা ভোটারদের লাইন দীর্ঘ হতে থাকে। ফলে নির্ধারিত সময়ের পরও ভোট গ্রহণ করা হয়। ভোট গ্রহণ শেষ হলে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক রইস উদ্দিন জানান, সারাদিন ভোটগ্রহণের সার্বিক পরিবেশ ভাল ছিল। বড় কোন ঘটনা ছাড়াই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আমরা শিক্ষকরা অবিভাবক। যারাই নির্বাচিত হয়ে আসবেন তারাই আমাদের প্রতিনিধি।
জকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মোতায়েন করা হয় পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি। ভোট গ্রহণ ও ভোট গ্রহণের পর বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
বিভাগভিত্তিক ভোটের চিত্রে দেখা যায় ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে একাউন্টিং বিভাগের ৩১৭ নম্বর রুমে ৪৮৮ ভোটারের মধ্যে ৩৬৪ জন এবং ৩১৬ নম্বর রুমে ৪৭৫ ভোটারের মধ্যে ৩৭৭ জন ভোট দিয়েছেন। মার্কেটিং বিভাগে ৬০২ জনের মধ্যে ৪০৮ জন এবং ফিন্যান্স বিভাগে ৬১৬ ভোটারের মধ্যে ৩৯৪ জন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ৪৭৩ জনের মধ্যে ৩২৯ জন, সাংবাদিকতা বিভাগে ৪৬৯ জনের মধ্যে ৩৩৮ জন এবং লোকপ্রশাসন বিভাগে ৪৬৪ জনের মধ্যে ২৮৫ জন ভোট দিয়েছেন। এছাড়া অর্থনীতি বিভাগে ৩২৭ জন এবং সমাজকর্ম বিভাগে ৩১৬ জন শিক্ষার্থী ভোট প্রদান করেছেন।
কলা অনুষদে বাংলা বিভাগে ৪৭৯ ভোটারের মধ্যে ৩৬৪ জন এবং ইতিহাস বিভাগে ৪৮৫ ভোটারের মধ্যে ৩৬০ জন ভোট দিয়েছেন। ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ৪৩৮ ভোটারের মধ্যে ২৯২ জন এবং দর্শন বিভাগে ৪৪৪ ভোটারের মধ্যে ২৯৪ জন ভোট দিয়েছেন। বিজ্ঞান অনুষদ ও অন্যান্য বিভাগে কাস্টিং ভোটের হার ছিল সন্তোষজনক। গণিত বিভাগে ৫২৫ ভোটারের মধ্যে ৩২৫ জন, রসায়ন বিভাগে ৫৩৫ ভোটারের মধ্যে ৩৪৭ জন এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে ২৮০ ভোটারের মধ্যে ১৪৪ জন ভোট দিয়েছেন। আইন বিভাগে ৫২৬ জনের মধ্যে ৪৩০ জন এবং আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগে ৪১২ জনের মধ্যে ৩২০ জন ভোট দিয়েছেন।
চারুকলা অনুষদের ড্রয়িং, পেইন্টিং ও প্রিন্ট মেকিং বিভাগে ২৯০ ভোটারের মধ্যে ১৬৫ জন এবং মনোবিজ্ঞানসহ চারুকলার অন্যান্য বিভাগে ১৬৮ জন শিক্ষার্থী ভোট দিয়েছেন। এছাড়া ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন বিভাগে ১৬৯ ভোটারের মধ্যে ১০০ জন ভোট দিয়েছেন।
মব সৃষ্টির অভিযোগ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে
ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর পরই শিবির সমর্থিত প্যানেলের ওপর হামলার জন্য তেড়ে আসার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য পরিষদের’ সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী রিয়াজুল ইসলামের স্ত্রী মাহিমা আক্তারকে হেনস্তা করে পুলিশে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। ছাত্রদলের দাবি, পরিচয়পত্র দেখাতে না পারায় ও জামায়াতের তিন নারী কর্মীকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে সহায়তা করায় পুলিশ মাহিমা আক্তারকে আটক করেছে। পুলিশ বলেছে, প্রাক্তন শিক্ষার্থী হয়েও নির্বাচনের প্রচার চালান মাহিমা আক্তার। তাঁকে হেনস্তার ঘটনা ঘটেনি। জিজ্ঞাসাবাদের পর অভিভাবকের জিম্মায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রার্থীর ওপর হামলা চেষ্টার অভিযোগ
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রফিক ভবনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে শিবিরের সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ইংরেজি বিভাগে ছাত্রদল তাদের প্যানেল পরিচিতি দিচ্ছিল। এটা আচরণ বিধির লঙ্ঘন বলে তাদের অবহিত করি। তখন তারা প্রার্থীদের মারার জন্য এগিয়ে আসেন। দর্শন বিভাগে আমাদের এজেন্টের সাথেও একই ঘটনা ঘটেছে। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শস্কিত। নির্বাচন কমিশন ছাত্রদলের অনুকূলে পক্ষপাতিত্ব করছে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে ওঠাতে রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এসময় তিনি আরো বলেন, ছাত্রদলের ভাইয়েরা প্রথম থেকে প্রধান ফটকে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। আমাদের যে ভাইয়েরা স্লিপ দিচ্ছিলেন তাদের হেনস্থা করা হয়েছে। এসময় নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্থা করা হয়। পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে নারী শিক্ষার্থীদের থেকে শিবিরের স্লিপ কেড়ে নেওয়া হয়। ছাত্রদল তাদের প্যানেল পরিচিতি অন্যান্য বিভাগের মতো দর্শন বিভাগে দিতে থাকে। আমাদের এজেন্টরা বাধা দিলে কেন্দ্রের ভেতরেই তাকে মারতে আসে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ইউটিএলের
নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেলের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)। অভিযোগে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট প্যানেলের পক্ষ থেকে ব্যালট নম্বর সম্বলিত বই ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করানো হয়েছে, যা নির্বাচনী আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। ইউটিএলের সদস্যসচিব অধ্যাপক ড. বিলাল হোসাইন বলেন, “দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে কথা বলেছি।
দুপুর থেকে বেড়েছে ভোটার উপস্থিতি
দিনের প্রথম তিন ঘণ্টায় বেশিরভাগ কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও দুপুর থেকে বেড়ে যায় ভোটার উপস্থিতি। ভোটের আগ্রহ জানতে চেয়ে মেহেদী হাসান নামে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, শীতের কারণে সকাল সকাল আসতে পারিনি। একটু দেরি হয়েছে। ১টার পর এসেছি। তখন বড় লাইন ছিলো। এটা আমার জীবনের প্রথম ভোট। লাইনে দাঁড়াতে একটু কষ্ট হলেও ভোট দিতে পেরে অনেক ভালো লাগছে। সোহান আহমেদ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা বন্ধুরা সবাই একসঙ্গে ভোট দিতে এসেছি। অনেকটা আনন্দে সময় কাটাচ্ছি জীবনের প্রথম ভোট দেবো’।
জানা যায়, এবারের নির্বাচনে মোট ১৬ হাজার ৬৪৫ শিক্ষার্থী ভোটার। তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য ৩৯টি কেন্দ্রে ১৭৮ বুথ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া একটি হল সংসদে ১২৪২ জন শিক্ষার্থী ভোটার রয়েছে। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র পদে ৪ জন, শিক্ষা ও গবেষণা পদে ৯ জন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ৫ জন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে ৫ জন, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে ৪ জন, আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে ৮ জন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে ৭ জন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ৭ জন, পরিবহন সম্পাদক পদে ৪ জন , সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক পদে ১০ জন, পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক পদে ৭ জন এবং সদস্য পদে ৭ জনের বিপরীতে ৫৭ জন প্রার্থীর প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
ছাত্রী হলে ১৩ পদের মধ্যে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে ৩ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ৩ জন, সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ২ জন, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে ২ জন, সংস্কৃতি সম্পাদক পদে ৪ জন, পাঠাগার সম্পাদক পদে ২ জন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ২ জন, সমাজ সেবা ও শিক্ষার্থীকল্যাণ সম্পাদক পদে ৩ জন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদকে ৪ জন এবং ৪টি সদস্য পদের বিপরীতে ৮ জন প্রার্থীর প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছে হল সংসদে।
জকসু নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কতা ছিলো চোখে পড়ার মতো। ভোট কেন্দ্রসহ ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বিপুল সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বহিরাগত প্রবেশ ঠেকাতে আগের রাত থেকেই প্রবেশ গেটে বিশেষ পাহারা বসানো হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করেন বিএনসিসি, রোভার স্কাউটস ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্যরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্টরা স্পেশাল কার্ড দেখিয়ে প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়।