সুমাইয়া নাজনীন, ল’ এ্যান্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়।

সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল বা ধারাবাহিকতার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে একজন তরুণ ভোটার হিসেবে আমার মনে যেমন প্রত্যাশার রেণু উড়ছে, তেমনি কিছু চিরচেনা শঙ্কাও কাজ করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পথে যে ব্যাধিটি দীর্ঘকাল ধরে ‘ক্যানসার’-এর মতো জেঁকে বসে আছে, তা হলো চাঁদাবাজি। বিভিন্ন খাতের তথ্য-উপাত্ত এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই একটি অপসংস্কৃতির কারণে আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধি যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও অসহনীয় হয়ে উঠছে। আমরা দেখেছি অতীতে যখনই ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ কেবল এক হাত থেকে অন্য হাতে গেছে, কিন্তু এর অবসান ঘটেনি। স্থানীয় রাজনীতির ছত্রছায়ায় ফুটপাত, পরিবহন স্ট্যান্ড এমনকি সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি নির্মাণের সময়ও নির্দিষ্ট অংকের চাঁদা দাবি করা ছিল একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত। পণ্যবাহী ট্রাক থেকে শুরু করে পাইকারি আড়ত পর্যন্ত স্তরে স্তরে চাঁদাবাজির ফলেই আজ সাধারণ ভোক্তার নাভিশ্বাস উঠছে। মাঠপর্যায়ে ১০ টাকার সবজি ঢাকায় এসে কেন ৫০ টাকা হয়, তার পেছনে এই অদৃশ্য হাতের ভূমিকা এখন আর কারও অজানা নয়। অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ যখনই কোনো নতুন ব্যবসা শুরু করতে চেয়েছে, তাকে শুরুতেই রাজনৈতিক মাশুল বা ‘সালামি’র মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে মেধাবী অনেক তরুণ বিনিয়োগ বিমুখ হয়ে পড়ছে। সামনের নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, কেবল মৌখিক আশ্বাসে আমরা আর সন্তুষ্ট হতে পারছি না। আমাদের চাওয়াগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও গঠনমূলক। চাঁদাবাজির সাথে জড়িত ব্যক্তি যদি ক্ষমতাসীন দলেরও হয়, তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। অপরাধীকে ‘রাজনৈতিক কর্মী’ হিসেবে নয়, বরং ‘জনগণের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি যেন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। পরিবহন সেক্টর এবং বাণিজ্যিক হাবগুলোতে নগদ লেনদেনের পরিবর্তে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম ও সিসিটিভি নজরদারি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। অটোমেশন চালু হলে চাঁদাবাজদের ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে পড়বে। থানা-পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া মাত্রই দ্রুত একশন নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগকারীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিশেষ করে কৃষি ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। পণ্যের সরবরাহ চেইন থেকে মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজদের সরিয়ে সরাসরি উৎপাদক ও ভোক্তার সংযোগ স্থাপন করতে হবে। একজন তরুণ ভোটার হিসেবে আমি মনে করি, চাঁদাবাজি কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে মেধা ও শ্রমের পূর্ণ মর্যাদা থাকবে। সামনের নির্বাচনে আমাদের ভোট হবে সেই নেতৃত্বের পক্ষে, যারা একটি চাঁদাবাজিমুক্ত, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার সৎ সাহস রাখবেন। আমরা আর পেছনে ফিরতে চাই না; আমরা চাই একটি ভয়হীন বাংলাদেশ, যেখানে পরিশ্রমের ফসল হবে কেবলই সাধারণ মানুষের।