সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান করে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা।

এদিকে এই রায়ের স্থগিতাদেশ চেয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সোমবার চেম্বার জজে আবেদন করা হলেও মঙ্গলবার এর শুনানি হয়নি। বুধবার এর শুনানী হতে পারে বলে বিশ^বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অপরদিকে যথাসময়ে শাকসু নির্বাচন দাবি করায় এক ছাত্রদল নেতাকে আজীবনের জন্য বহিস্কার করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল।

উল্লেখ্য-দীর্ঘ ২৮ বছর পর মঙ্গলবার শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীর একটি রিটের শুনানিতে চার সপ্তাহের জন্য নির্বাচন স্থগিতের আদেশ দেন উচ্চ আদালত। এর প্রতিবাদে সোমবার দুপুর থেকেই আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

সোমবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। এতে ভিসি প্রো-ভিসি, কোষাধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রারসহ শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা অবরুদ্ধ হয়ে হয়ে পড়েন। পরে সোয়া ২টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধের কারণে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

এক পর্যায়ে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করে ফের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থী। তখনও অবরুদ্ধ ছিলেন ভিসি, প্রোভিসিসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। পরে কয়েকদফায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক হয়। এক পর্যায়ে উপাচার্যকে সিলেট না ছাড়ার শর্তে প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে রাত ১টা ১৫ মিনিটের দিকে তারা প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দেন এবং সকালে গোলচত্ত্বরে সমাবেশের ঘোষণা দেন।

বিক্ষোভ কর্মসূচিতে তারা ‘সাস্টিয়ান সাস্টিয়ান এক হও, এক হও’, ‘শাকসু নিয়ে তালবাহানা চলবে না চলবে না’, ‘শাকসু নিয়ে মববাজি চলবে না চলবে না’, ‘শাকসু চাই শাকসু দাও, নইলে গদি ছাইড়া দেও’, ‘দালালদের গদিতে আগুন জ্বালো একসঙ্গে’, ‘শাকসু মোদের অধিকার, রুখে দেওয়ার সাধ্য কার’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।

কর্মসূচিতে শিবিরের ভিপি প্রার্থী দেলোয়ার হাসান শিশির বলেন, সোমবার আমরা প্রশাসনের সঙ্গে বলেছি যে, যেভাবেই হোক চেম্বার জজ আদালতের মাধ্যমে বুধবার শাকসু নির্বাচন করতে হবে। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চাপ দেওয়া হবে। কেননা আমাদের দাবি যৌক্তিক।

শিবিরের জিএস প্রার্থী মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ২৮ বছর পর মঙ্গলবার আমাদের নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন মহলের ষড়যন্ত্রের কারণে নির্বাচন হয়নি। সোমবার চেম্বার জজের শুনানি হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তা হয়নি। মঙ্গলবার আদালতের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। আশা করছি, চেম্বার জজ শাকসু নির্বাচনের পক্ষে রায় দেবেন।

এ ব্যাপারে শাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী পলাশ বখতিয়ার বলেন, ভিসি প্রোভিসি ট্রেজারাররা অবরুদ্ধ ছিলেন, তাদের পক্ষ থেকে যেন সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয় সেই প্রেক্ষিতে আমরা তাদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিলাম। শাকসু নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২০ একরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এমনকি আমাদের প্রশাসনের হাতেও পুরোটা নেই। এটি হাইকোর্টে চলে গেছে। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন তারা যতকিছু করা সম্ভব তারা রিটটি খারিজ করার চেষ্টা করবেন।

তিনি আরও বলেন, আমার নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেছি ভিসি স্যার ক্যাম্পাস ছেড়ে যাবেন না তিনি এটিও আশ্বস্ত করেছেন যদি উনাকে ঢাকা যাওয়া দরকার হয় তিনি শুধু ঢাকা যাবেন শাকসু বাস্তবায়নের জন্য।

ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার :

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনের পক্ষে থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশগ্রণ করায় ছাত্রদল নেতাকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে। সোমবার রাতে ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত প্রেরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

স্বতন্ত্র সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. জুনায়েদ হাসানকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করেছে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে শাবিপ্রবি ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জুনায়েদ হাসানকে সাংগঠনিক পদ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হলো।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির আজ এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। ছাত্রদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে কোনরূপ সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন।

জানা যায়, শাকসু নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা ঢাকায় নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করে দুই দিন আন্দোলন করছে। কিন্তু জুনায়েদ হাসানকে শাকসুর দাবিতে শাবিপ্রবিতে সরব ছিলেন।

উল্লেখ্য, গত ১৭ জানুয়ারি বিকেলে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ১৪ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেন। যেখানে জুনায়েদ হাসান সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ছাত্রসংসদ একটি স্বতন্ত্র প্লাটফর্ম কোনো রাজনৈতিক প্লাটফর্ম নয়। সেই জায়গা থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার লক্ষ্যে আমি স্বতন্ত্রভাবে দলীয় প্রভাবমুক্তভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।

দলীয় চাপে তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যতই দলীয় চাপ আসুক তাতে আমি ভয় করছি না। শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার লক্ষ্যে আমি নির্বাচনের সর্বশেষ পর্যন্ত মাঠে থাকব। আশা করছি শিক্ষার্থীরা এটাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করবেন।

রাবিতে মানববন্ধন

রাবি রিপোর্টার: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে ও অনতিবিলম্বে শাকসু বাস্তবায়নের দাবিতে মানববন্ধন করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাত্রশিবির। এসময় নেতৃবৃন্দ আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই শাকসু নির্বাচনের দাবি জানান। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাবি প্যারিস রোডে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে শাখা শিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় হাসিনাকে দেওয়া ৯ দফার অন্যতম একটি দফা ছিল ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ চালু। হাসিনা পালিয়েছে, তবে ছাত্রদল ও বিএনপি ছাত্র সংসদ নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। রাকসুর সময়ও তারা একের পর এক চারবার নির্বাচন স্থগিত করেছিল।’ মুজাহিদ বলেন, ‘আজ শাকসু নির্বাচনের কথা ছিল, তবে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা-কর্মী টোকাই বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের সাহায্যে নির্বাচন কমিশনের সামনে মব সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচাল করে দিয়েছে। তারেক রহমান কোর্টকে হাসিনার ন্যায় ব্যবহার করে শাকসু নির্বাচন বন্ধ করেছেন। দ্বিতীয় স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে মানুষ যে ভোটাধিকার পেয়েছে তার বিরুদ্ধে কেউ অবস্থান করলে বাংলার মানুষ ও ছাত্রসমাজ আবার জেগে উঠবে।’ তিনি বলেন, ‘অনতি অবিলম্বে শাকসু নির্বাচন কার্যকর করতে হবে এবং সেটা অবশ্যই জাতীয় নির্বাচনের আগে বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি এর ব্যত্যয় ঘটে, যদি আবারও তারেক রহমানের ইন্টারফেয়ারের (হস্তক্ষেপ) মাধ্যমে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করা হয়, তাহলে সারা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী শিক্ষার্থীরা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে দাঁড়াবে।’

রাকসুর ভিপি ও সাবেক শিবির শাখা সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আচরণকারী একটা গোষ্ঠী, তারা ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে ভয় পায়। তারা বারবার নির্বাচনের পরেও হেরে যায়। তারা ইতিমধ্যে অনেক ছাত্র সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের চাওয়ার বিরুদ্ধে যদি কেউ কিছু করতে চায় তাহলে সেটা শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করবে না। এটা ছাত্র সংসদ নির্বাচনই বলে দেয়।’ শিবিরের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক শামীম পাটোয়ারী বলেন, ‘ছাত্রদল কয়েক দিন ধরে শাকসু নির্বাচন বানচালের জন্য আন্দোলন করছে। আবার হাইকোর্টের আইনজীবীরাও রিটকারীর পক্ষে কাজ করে শাকসু স্থগিত করেছে। সর্বোপরি বলতে পারি, একটা কমপ্লিট প্যাকেজ মিলিতভাবে কাজ করেছে শাকসু নির্বাচন বানচালের জন্য।’ মানববন্ধনে শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের সঞ্চালনায় বিভিন্ন হল সংসদের ভিপি ও হল শাখা শিবিরের সভাপতিরা বক্তব্য দেন। এ সময় শিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।