ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি গঠনের অধ্যাদেশ জারির এক দফা দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মত সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায় সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসাবে তারা গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১টায় সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় অবরোধ করেন। এরপর দুপুর ১টার দিকে শিক্ষার্থীরা টেকনিক্যাল মোড় অবরোধ করেন। সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় আটকে অবস্থান নেয় ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ ও বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা। আর টেকনিক্যাল মোড়ে অবস্থান নেয় সরকারি বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থীরা। বিকেল ৫টায় আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীদের একজন অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর ফলে সোয়া চার ঘণ্টা পর বিকেল পাঁচটায় সায়েন্স ল্যাব মোড় হয়ে মিরপুর সড়ক ও আশপাশের সড়কগুলোয় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে রোববারের মধ্যে দাবি না মানলে আগামী সোমবার তারা সায়েন্স ল্যাব মোড়ে আবারও অবরোধ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীদের একজন নাঈম হাওলাদার অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে বলেন, রোববারের মধ্যে সরকার ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ জারি না করলে সোমবার তারা সায়েন্স ল্যাব মোড়ে আবারও অবরোধ করবেন। অধ্যাদেশ জারি না হলে সেদিন শিক্ষার্থীরা অধ্যাদেশ মঞ্চ তৈরি করবেন। পরবর্তী কর্মসূচি সেই মঞ্চ থেকে ঘোষণা করবেন। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বের হন। দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে তারা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন। আন্দোলনরত সাতটি কলেজ হলো ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজ।

অবরোধ চলাকালে তারা উই ওয়ান্ট উই ওয়ান্ট, অর্ডিন্যান্স অর্ডিন্যান্স, রাষ্ট্র তোমার সময় শেষ, জারি করো অধ্যাদেশ, আমি কে তুমি কে, ডিসিইউ ডিসিইউ ইত্যাদি স্লোগান দেন।

শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের কারণে মিরপুর সড়ক ও আশপাশের অন্যান্য সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো মানুষ। গাড়ি না পেয়ে তারা হেঁটে গন্তব্যে যান।

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, আমরা চূড়ান্ত অধ্যাদেশ চাই, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির আইনি ভিত্তি চাই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানুয়ারি মাসেই অধ্যাদেশ জারি হবে বলেছিল। কিন্তু তা হয়নি। আমরা দ্রুততম সময়ে অধ্যাদেশ জারি করতে মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থী মো. জুয়েল রানা বলেন, আমরা দ্রুততম সময়ে অধ্যাদেশ চাই। অনেক টালবাহানা আমাদের নিয়ে করেছেন। এখন অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে আমাদের একাডেমিক পরিচয় দিন।

এর আগে বুধবার সায়েন্স ল্যাবরেটরি, টেকনিক্যাল মোড়, মহাখালী আমতলী এবং সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় অবরোধ করেছিলেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। তবে দাবির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সাড়া না মেলায় পরদিনও অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেন তারা।

সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের একাংশ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ জারির দাবিতে গত ৭ ও ৮ ডিসেম্বর শিক্ষা ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। শিক্ষার্থীরা বলছেন, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানুয়ারির প্রথম দিকে অধ্যাদেশ জারির কথা বলেছিল।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশিত হয়, যেটির প্রস্তাবিত স্কুলিং কাঠামোর বিরোধিতা করছেন কলেজগুলোর শিক্ষকরা। তাদের আশঙ্কা, এ খসড়া চূড়ান্ত হলে তাদের পদোন্নতির মতো মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। কলেজগুলোর বর্তমান শিক্ষার্থীদের একাংশ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির আইনি কাঠামো দ্রুত নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে দ্রুততম সময়ে অধ্যাদেশ জারির দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে উচ্চ মাধ্যমিক ও অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের একাংশ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের মতই প্রস্তাবিত কাঠামোর বিরোধিতা করে বলছেন, স্কুলিং কাঠামোতে কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে না।

খসড়া অধ্যাদেশে সাতটি কলেজকে চারটি স্কুলে বিভক্ত করে ইন্টারডিসিপ্লিনারি বা স্কুলিং কাঠামোতে বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী কলেজগুলোতে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠদানও চালু থাকবে। এ খসড়া নিয়ে বিভক্তি দেখা দিলে তা পরিমার্জন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরিমার্জিত খসড়াটি মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ভাঙচুর

সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় অবরোধের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাস ভাঙচুর করার অভিযোগ উঠেছে সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসাবে গতকাল দুপুর পৌনে ১টায় সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় অবরোধ করেন তারা। এরপর আড়াইটার দিকে অবরোধে আটকে থাকা বাসটি ভাঙচুর করা হয় বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ভাঙচুরের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর রফিকুল ইসলাম বলেন, অর্জন নামের বাসটি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ায় দুটি জানালার কাচ ভেঙেছে। বাসের বহিরাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের দুইজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। বাসটি হাজারীবাগে অবস্থিত লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট থেকে ক্যাম্পাস রুটে শিক্ষার্থীদের আনা নেওয়া করে। দুপুরের ট্রিপ চলাকালে সায়েন্সল্যাবে আন্দোলনকারীদের ভাঙচুরের শিকার হয় সেটি। বাসটি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো একটি ভিডিওতে অবরোধে আটকে পড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসটি ঘিরে তরুণদের দুটি পক্ষের হুড়োহুড়ি দেখা গেছে। তারা হাতাহাতিতেও জড়িয়েছে। একপর্যায়ে বাসটিকে ধাওয়া ও ঢিল ছোড়া হয়। অনেকে জুতা ছুড়ে মারেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তরের পরিচালক কামরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বাসের পেছনের গ্লাস পুরো ভেঙে গেছে, দরজা, বাইরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে “শিক্ষার্থীদের মবের মধ্যে পড়েছে, আমাদের কিছু করার ছিল না।

ভাঙচুর করা বাসে থাকা রাইসুল ইসলাম নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ফেইসবুকে লিখেছেন, ঢাকা কলেজ তিন-চারদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসটি আটকে রেখেছিল। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম সেখানে গিয়ে বাসটি বের করে আনলে, সেখানে তারা ইটপাটকেল ছোড়েন।

ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মুহাম্মদ ঘটনার বিষয়ে ফেইসবুকে লেখেন, আন্দোলনের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপরে নৃশংস হামলা ও বাসে ভাঙচুর চালিয়েছে। এই হামলার সঙ্গে জড়িতদেরকে ভিডিও ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।