মানুষ দেহ, মন ও আত্মার সমন্বিত সত্তা; একটি আরেকটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই বিশ্বাস, আত্মিক প্রশান্তি ও নৈতিক অনুশীলনের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক সুস্থতা মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার একটি অপরিহার্য অংশ; যা কেবল চিকিৎসাবিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত আল্লাহর ইবাদত, নামাজ, দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির মানুষের দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, হতাশা, আত্মহত্যাপ্রবণতা ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট (বিআইআইটি) কর্তৃক আয়োজিত ‘ফেইথ, মাইন্ড, অ্যান্ড হিলিং: ইসলামিক অ্যাপ্রোচেস টু মেন্টাল হেলথ’ শীর্ষক বিশেষ বক্তৃতায় এসব কথা বলেন অস্ট্রেলিয়ার চার্লস স্টার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক সাইকোলজির অধ্যাপক ড. জি. হুসেইন রাসুল। গতকাল বুধবার, বিআইআইটি লাইব্রেরি এন্ড রিসোর্স সেন্টারে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. রাসুল বলেন, ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে বিরোধী নয়। কগনিটিভ থেরাপি, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও ট্রমা কাউন্সেলিং-এর মতো আধুনিক পদ্ধতিগুলো ইসলামী নৈতিকতা ও আত্মিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত হলে আরও কার্যকর ও টেকসই ফলাফল পাওয়া সম্ভব। মানসিক রোগকে দুর্বলতা বা ঈমানের ঘাটতি হিসেবে দেখা উচিত নয়। আরোগ্যের জন্য চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং গ্রহণ ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেহের যেমন চিকিৎসা প্রয়োজন, তেমনি মন ও আত্মারও যতœ দরকার।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বাস মানুষকে আশার আলো দেখায় এবং হতাশা থেকে রক্ষা করে। স্রষ্টাকে স্মরণ অন্তরে প্রকৃত প্রশান্তি আনে। বিপদের সময় আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) মানুষকে মানসিকভাবে শক্ত করে তোলে এবং জীবনের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাহস জোগায়। আবেগ, রাগ, লোভ ও হতাশা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর ধৈর্য (সবর), কৃতজ্ঞতা (শুকর) এবং আত্মসমালোচনা (মুহাসাবা)। ক্ষমাশীলতা ও ইতিবাচক চিন্তার চর্চা মানসিক চাপ কমায় এবং সামাজিক সম্পর্ক উন্নত করে। পারিবারিক বন্ধন, পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। সহানুভূতিশীলদের পাশে পেলে মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষ একাকিত্বে না ভুগে সমর্থন পায়। যাকাত, সদকা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ সমাজে মানসিক নিরাপত্তা ও মানবিক পরিবেশ তৈরি করে, যা মানসিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে অধ্যাপক ড. এম আবদুল আজিজ বলেন, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে এই সমস্যার সমাধান তুলে ধরতে বক্তৃতাটি আয়োজন করছে বিআইআইটি। ইসলাম মানুষের দেহ, মন ও আত্মা-সবকিছুকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেয়। মানসিক সুস্থতার জন্য আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখা, আত্মিক চর্চা বৃদ্ধি করা এবং প্রয়োজনে পেশাদার চিকিৎসার সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে এখনো মানসিক সুস্থতার ব্যাপারটি অবহেলিত, প্রকৃত সুস্থতার দিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ কম। সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তা, অস্থিতিশীলতা এবং দুর্যোগপ্রবণ বাস্তবতার সমাজে উপযোগী মডেল প্রদান করতে পারে ইসলামী সাইকোলজিক্যাল কাঠামো।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো. ফজলে এলাহি বলেন, নফস (আত্মসত্তা), কলব (হৃদয়), আকল (বুদ্ধি) ও রূহ (আত্মা) এর সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে মানব ব্যক্তিত্ব ও আচরণকে বুঝতে হবে। তাযকিয়াতুন নফস বা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নফসকে পরিশীলিত রাখতে হবে। কলবকে নৈতিক সচেতনতার কেন্দ্রে রাখতে হবে। আশাকে সাইকোলজিক্যাল প্রেরণা হিসেবে নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পেশাজীবী, গবেষক এবং বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন এবং আলোচনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। আলোচকগণ মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক চাপ, যুব সমাজের মানসিক সংকট এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং সেবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন।