সাকীফ বিন আলম, ইবি : ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় তার স্বামী ইমতিয়াজুর সুলতান বাদী হয়ে থানায় এজহার দায়ের করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলুর রহমানকে প্রধান আসামী করে মোট ৪ জনের বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়।

মামলার অন্য আসামীরা হলেন- সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, বিভাগের সাবেক সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার এবং সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান। এদিকে, নিহতের স্বামীর বড় ভাই আবদুর রশিদ বলেন, “কর্মস্থলে এমন হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। এ ঘটনায় কিছু রাঘববোয়াল জড়িত আছে, আমরা প্রশাসনের কাছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”

প্রাথমিক ময়নাতদন্তে যা জানা গেছে

সকাল সাড়ে ৯টায় কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে অধ্যাপিকা আসমা সাদিয়া রুনার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ইমাম হোসাইন জানান, প্রাথমিক ময়নাতদন্তে দেখা গেছে, গলার ডান পাশের নিচের দিকে একটি গভীর ক্ষত ছিল। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গলার একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালী কেটে যায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণই তার মৃত্যুর প্রধান কারণ।

তিনি আরও জানান, শিক্ষিকার শরীরের বিভিন্নস্থানে (বুকে, পিঠে, পেটে ও হাতে) অন্তত ২০টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তবে সেগুলো গভীর নয়। ধারণা করা হচ্ছে, হামলার সময় নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি এসব আঘাত পেয়েছেন। ময়নাতদন্ত শেষে সকাল ১০টার দিকে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও ৯ দফা দাবি

এদিকে, এই হত্যার বিচার দাবিতে সকাল সাড়ে ১০টায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের সামনে থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি প্রশাসন ভবনের সামনে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়।

সমাবেশে শিক্ষার্থীরা ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- হত্যাকারীর দ্রুত ফাঁসি নিশ্চিত করা ও পেছনের ষড়যন্ত্রকারীদের শাস্তি; ক্যাম্পাস, হল ও বিভাগে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন; স্মার্ট আইডি ছাড়া ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ; কর্মচারীদের জন্য আলাদা পোশাক ও নামফলক চালু করা; ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা।

সমাবেশে উপস্থিত সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন, “গতকাল যে ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত নৃশংস ও মর্মান্তিক। এমন ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা হতে পারে না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”

জানাযা ও দাফন সম্পন্ন

বাদ জোহর কুষ্টিয়ার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে শিক্ষিকার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কুষ্টিয়া-০৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমীর হামজা, ইবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম ইয়াকুব আলীসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা অংশ নেন। পরে কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় পৌর গোরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, “আসমা সাদিয়া রুনার মতো ভালো মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। হত্যাকারী চিহ্নিত। প্রশাসন ও তার পরিবার হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছে এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।”

উল্লেখ্য, গতকাল বুধবার বিকেলে বেতন নিয়ে ঝামেলা ও বদলির জেরে নিজ কার্যালয়ে সাবেক কর্মচারী ফজলুর রহমানের ছুরিকাঘাতে নিহত হন এই শিক্ষিকা। বর্তমানে অভিযুক্ত ফজলুর রহমান চিকিৎসাধীন অবস্থায় পুলিশ হেফাজতে আছে।

রাবি’র শিক্ষকদের প্রতিবাদ

রাবি রিপোর্টার জানায়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ জন নারী শিক্ষক।

এক যুক্ত বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, একজন কর্মচারী বিশ্ববিদ্যালয় চলাকালীন নিজ কক্ষে একজন শিক্ষককে হত্যার করা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। শিক্ষকবৃন্দ সরকারের কাছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলুর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন, প্রফেসর ড. দিল আরা হোসেন, প্রফেসর ড. শাহনাজ পারভীন, প্রফেসর ড. মোছা. আশীয়ারা খাতুন, প্রফেসর ড. মোছা. ফাহমিদা চৌধুরী, প্রফেসর ড. ফৌজিয়া এদিব ফ্লোরা, প্রফেসর ড. লাভলী নাহার, প্রফেসর ড. শারমীন হামিদ, প্রফেসর ড. তারান্নুম নাজ, প্রফেসর ড. সনজিদা মইদ, প্রফেসর ড. যাহার-ই-তাশনীম, প্রফেসর ড. কাজী সেলিনা সুলতানা, প্রফেসর ড. সাবিনা সুলতানা, প্রফেসর ড মোসা. মর্জিনা বেগম প্রমুখ।