নানামুখী চাপের মুখে জবি প্রশাসন
কয়েকদিন ধরে ভিসির পদত্যাগ দাবি
নির্বাচনের আগের দিন নানান অভিযোগ ছাত্রদলের প্যানেলের
ইবরাহীম খলিল/ মো : সামিউল ইসলাম : নানামুখী শঙ্কা আর চ্যালেঞ্জের মুখে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আজ। জকসুর ভোট গ্রহণ শুরু হবে আজ সকাল সাড়ে ৮টা থেকে। নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সংসদের জন্য ৩৮টি এবং হল সংসদের জন্য ১টি ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচনে প্রতি ১০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি করে ভোটগ্রহণ বুথ থাকছে। ভোটগ্রহণ শেষে ৬টি ওএমআর মেশিনের মাধ্যমে ভোট গণনা করা হবে।
এদিকে নির্বাচনের আগেই হেরে যাওয়ার শঙ্কায় নানা অনৈতিক দাবি তোলা হচ্ছে একটি প্যানেলের পক্ষ থেকে। প্রশাসনকে পক্ষে নিতে নানা রকমের স্টিগমা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি খোদ ভিসির পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে অব্যাহতভাবে। ডিজিটাল যুগেও ম্যানুয়াল গণনার দাবি করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ভোটগ্রহণ আর ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা পালন করা হবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক রেজাউল করিম গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণ ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষ থাকবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এজন্য বার বার ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া পরীক্ষানিরীক্ষা করা হচ্ছে। বার বার মিটিং করা হচ্ছে। এরপরও কোন সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বাহাদুর শাহ পার্কে পুলিশের কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ব্যবহৃত ভোট গণনা মেশিনে ডেমো ভোটের ফলাফলে অসংগতির অভিযোগ তুলেছে ছাত্রদল ও ছাত্রঅধিকার সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’। কিন্তু জবি নির্বাচন কমিশন বলছে, প্রশাসন সুষ্ঠু নির্বাচন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রথমত মেশিনে কোন অসঙ্গতি থাকলে তা হাতে গণনা করা হবে। এরপরও নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হবে।
জকসু ও হল শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ৮ দফা বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাতে বলা হয়, ১) ভোট প্রদানের উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীরা কেবলমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেইট (প্রধান ফটক) দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবেন; ২) ভোট প্রদান শেষে শিক্ষার্থীদের অবশ্যই ২ ও ৩ নম্বর গেইট দিয়ে দ্রুত ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে হবে; ৩) শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ের আগেই শুধুমাত্র ২ নম্বর গেইট দিয়ে প্রবেশ করতে বলা হয়েছে; ৪) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইডি কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে প্রবেশ করতে হবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভোট চলাকালীন সময়ে তারা ক্যাম্পাসের বাইরে যাতায়াত করতে পারবেন না; ৫) বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক গেইট ও পোগোজ স্কুল গেইট নির্বাচন চলাকালীন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে; ৬) ক্যাম্পাসে বসবাসরত কর্মচারীদের পরিবারের সদস্যরা ভোটগ্রহণ চলাকালীন বাইরে ঘোরাফেরা করতে পারবেন না; ৭) যে-কোনও জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে ভোটগ্রহণ শুরু থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে মেডিক্যাল টিম অবস্থান করবে; ৮) নির্বাচনি দায়িত্বে নেই এমন সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করতে হবে।
ছাত্রদলের প্যানেলের নানা তৎপরতা :
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ওএমআর মেশিন বাদ দিয়ে হাতে ভোট গণনার দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল ও ছাত্রঅধিকার সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেল। গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রফিক ভবনের নিচে এক জরুরি সংবাদিক সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। সংবাদিক সম্মেলনে প্যানেলের এজিএস পদপ্রার্থী বিএম আতিকুর রহমান তানজিল অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের একটি মিটিংয়ে ডাকা হয়েছিল, যেখানে বিভিন্ন প্যানেলের প্রতিনিধি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সামনে ডেমো ভোট গণনা দেখানো হয়। সেখানে আমরা স্পষ্ট অসংগতি লক্ষ্য করি। একটি মেশিনে এক ধরনের ফলাফল, অন্য মেশিনে ভিন্ন ফলাফল দেখা যায়।
এদিকে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে ভিপি-জিএস ও এজিএস পদ থেকে নানা কারণ দেখিয়ে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীদেরকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ৫ প্রার্থী। এ ছাড়াও অন্যান্য পদে আরও কয়েকজন পারিবারিক-পারিপার্শ্বিক অবস্থা তুলে ধরে সংবাদিক সম্মেলন ও ফেসবুক লাইভে এসে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। শেষ মুহূর্তে এসে জকসু নির্বাচন থেকে প্রার্থীদের সরে দাঁড়ানোকে ভিন্ন চোখে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একাধিক প্রার্থীকে চাপ প্রয়োগ করে সরিয়ে দেওয়ারও অভিযোগ উঠে। সর্বশেষ ২৯ ডিসেম্বর সরে দাঁড়ান সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক পদপ্রার্থী সুজন চন্দ্র সুকুল। পরদিন ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। তবে এদিন ভোটগ্রহণ স্থগিতের ঘোষণা দেয় নির্বাচন কমিশন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফারিহা তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘বাস্তবতা হচ্ছে সুজনকে খুন করা হবে এই থ্রেট দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন না করার জন্য সর্বোচ্চ চাপ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন করলে সুজনকে নিশ্চিত মেরে ফেলা হতো। এই চাপের জন্য নিজের জীবন বাঁচতে রাত ৩ টায় সুজন নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু যারা এটা করেছে তারা অবশ্যই ভুল করেছে। খুনের হুমকি দিয়ে ভোটের রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জায়গায় আগানো যায় না। ভোটের রাজনীতির হিসেব অন্যরকম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এতোটুকু মেধা আছে বাস্তবে কি ঘটেছে এটা বোঝার। নাহলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় চান্স পেত না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটের বিষয়ে এই প্রার্থী বলেন, ‘বাবা-মা না চাওয়ায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছি। নির্বাচনের আগের দিন একজনকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে আসি। এরপর থেকে একটা মানসিক হীনমন্যতায় ভুগতেছি। সরে দাঁড়ানোর কারণ অনেকে জানতে চাওয়ায় আমার ফেসবুক আইডি ডিএকটিভেট করি। পরে আজ জানতে পারি, আমার ফেসবুক ম্যাসেজিংয়ের একটি স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় :
ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ানের তোলা প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশন বলছে, এর সঙ্গে নির্বাচনি অস্বচ্ছতার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসানর সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত মক ভোটিং ১ এ ব্যবহৃত একটি ব্যালট পেপার ভুলক্রমে অব্যবহৃত ব্যালটের সঙ্গে একটি খামে সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে ৪ জানুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত মক ভোটিং–২ চলাকালে সেটি অব্যবহৃত ব্যালট ভেবে একজন প্রার্থীকে দেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশন বলছে, এটি সম্পূর্ণভাবে একটি প্রশাসনিক ভুল এবং এর সঙ্গে নির্বাচনের স্বচ্ছতা বা নিরপেক্ষতার কোনো যোগসূত্র নেই। কমিশন দাবি করে, জকসু নির্বাচনকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে তারা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ব্যবহৃত আংশিক ব্যালট পেপারের ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন ও অনিচ্ছাকৃত ভুল, যা দিয়ে আসন্ন জকসু নির্বাচনের স্বচ্ছতা বা গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই।
ছাত্র শিবিরের সাংবাদিক সম্মেলন
নির্বাচনের সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত করতে একাধিক দাবি জানিয়েছে শিবির সমর্থিত অদম্য জবিয়ান ঐক্য প্যানেল। সোমবার রফিক ভবনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে এসব দাবি তুলে ধরেন।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ভোটের আগেই পোলিং এজেন্টদের কার্ড এবং প্রার্থীদের আলাদা পরিচয়পত্র প্রদান করতে হবে, যাতে প্রার্থীদের সহজে শনাক্ত করা যায়। তিনি আরও বলেন, বিএনসিসি ও অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে ট্রায়ালের মাধ্যমে দায়িত্ব দেওয়া, শিক্ষকদের উপস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা শিক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাই করা এবং ভোটের দিন লিফলেট বিতরণ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নিশ্চিত করা জরুরি। সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের কার্ডে ছবি সংযুক্ত করা আবশ্যক। এছাড়া শিক্ষার্থীরা যেন উৎসবমুখর পরিবেশে ভয়ভীতি ছাড়াই ভোট দিতে পারে, তা প্রশাসনের দায়িত্ব। বিশেষভাবে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে কোনো ধরনের হয়রানি বা বুলিং হতে দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি ভোট গ্রহণ ও ফলাফলের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
অযথায় ভিসির পদত্যাগ দাবি
অভিজ্ঞ গবেষক হিসেবে পরিচিত জগন্নাথের ভিসি অধ্যাপক রেজাউল করিম শিক্ষক জীবন থেকেই নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত এবং সব শিক্ষার্থীর ওপর সমান আচরণের পক্ষপাতী। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও খুবই নিয়ম মেনে চলা মানুষ। নিরপেক্ষ নির্বাচন করার লক্ষ্যে সবরকমের ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে তিনি। জকসু নির্বাচন যাতে কোনভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সেজন্য সব শেষ সময় পর্যন্ত অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। এরপরও একটি পক্ষ ভিসির পদত্যাগের দাবি করছেন। এই দাবিকে অনৈতিক দাবি আদায়ের হাতিয়ার বলছেন অনেকেই। এই বিক্ষোভকারীরা মাঝেমধ্যে সভ্যতা বভ্যতার সীমা লঙ্ঘন করে বলে অভিযোগ করেন প্রশাসনের কর্তকর্তা ও কর্মচারীরা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক রেজাউল করিম দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে জানিয়েছেন, প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি পিছুপা হবেন না বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য,এর আগে দুই দফা পিছিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচনের নতুন তারিখ ঘোষণা করা বিগত বছরের ৩০ ডিসেম্বর। এদিন নির্বাচন শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে ভোর ৬ টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এর প্রেক্ষিতে জরুরি সিন্ডিকেট সভায় নির্বাচন স্থগিত করা হয়। এরপর দিনভর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ফের জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডেকে ৬ জানুয়ারি নির্বাচনের নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়।