দেশের মূল্যস্ফীতি বর্তমানে যে পর্যায়ে রয়েছে, আগামী বাজেটের পর তা আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিড)। সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশ নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বাস্তবসম্মত ও সংস্কারভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে এমন পূর্বাভাস ও পরামর্শ দেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়লে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়া এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। দেশের পূর্ববর্তী ঋণ এবং বর্তমান জ্বালানি সমস্যার কারণে নতুন করে ঋণ করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

এই গবেষক আরো বলেন, রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় অনেক সময় সম্ভব হয় না, ফলে উন্নয়ন ব্যয় ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় চাপ তৈরি হয়।

তিনি বলেন, যাদের করের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে, তাদেরও করের আওতায় আনতে হবে। কর দিতে বাধ্য করতে হবে, তবে আওতা বাড়াতে হবে এবং সাধারণের উপর করের হার কমাতে হবে। সরকারি ব্যাংক এবং সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়াতে হবে। না হলে এসব প্রতিষ্ঠান ভর্তুকি দিয়ে চালু রাখার যৌক্তিকতা নেই।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচায বলেন, কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা ও করদাতারা লাভবান হলেও সরকার ঠকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অর্থনীতিবিদ ।

তিনি জানান, এনবিআর কর্মকর্তাদের বড় সমস্যা হলো তারা তাদের হাতে থাকা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছাড়তে চান না। বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যবস্থায় গেলে এই স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় তারা এতে অনাগ্রহী।

জ্বালানি খাত বিষয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মত দেন, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সামষ্টিক অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন জরুরি। দেশের আর্থিক সক্ষমতা, ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা ও বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতির অবস্থা পরিষ্কারভাবে নিরূপণ না করে জ্বালানি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা ভুল পথে যেতে পারে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় যদি এককভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সমন্বয়ের অভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি আমদানির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বৈদেশিক সম্পর্ক কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলে তা রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। সরকারের ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে তিনি তিনটি দিক তুলে ধরেন- আমদানি ও সরবরাহ বৃদ্ধি, শুল্ক কমানো এবং প্রয়োজনে দাম বৃদ্ধি। তিনি উল্লেখ করেন, এরই মধ্যে জেট ফুয়েলের দাম বেড়েছে এবং অন্যান্য জ্বালানির দামও বাড়তে পারে।