মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম (বান্দরবান)
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার গহীন অরণ্যে উৎপন্ন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী মাতামুহুরী আজ নাব্যতা সংকটে অস্তিত্ব হারানোর মুখে পড়েছে। একসময়কার খরস্রোতা এ নদী এখন শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই বিভিন্ন স্থানে বালুচরে ভরাট হয়ে পড়ছে।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম জেলা প্রশাসক টিএইচ লুইন ১৮৬৯ সালে তাঁর গ্রন্থে মাতামুহুরী নদীর নান্দনিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দেন। একসময় বর্ষা শেষে দীর্ঘ সময়জুড়ে নদীতে পানির প্রবাহ বজায় থাকলেও বর্তমানে নদীর সেই প্রাণচাঞ্চল্য আর নেই।
প্রায় ১১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী আলীকদম, লামা ও চকরিয়া উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষায় ১৮৭৮ সালে তৎকালীন পূর্ব বেঙ্গল সরকার এর দুই তীরবর্তী প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার একর বনভূমিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করে, যা ‘মাতামুহুরী রেঞ্জ’ নামে পরিচিত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই দশকে নদীর নাব্যতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, নদীর ঢালে তামাক চাষ, পাহাড় কেটে জুমচাষ, অবৈধভাবে পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ এবং পাথর উত্তোলনের ফলে নদীতে পলি জমে ভরাট হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে মাটি ও বালি নদীতে এসে জমে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
নাব্যতা সংকটের কারণে নদীপথে নৌযান চলাচল, কাঠ ও বাঁশ পরিবহন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একসময়কার গভীর জলাশয় বা ‘কুম’গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে গেছে। এতে জীবিকা হারাচ্ছেন স্থানীয় জেলেরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আলীকদম থেকে চকরিয়া পর্যন্ত নদীপথে ত্রিশটিরও বেশি কুম ছিল, যার অধিকাংশই এখন বিলীন। ফলে নদীভিত্তিক জীববৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যও হারিয়ে যাচ্ছে।
নদী রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিংয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ড্রেজিংয়ের আগে নদীর পূর্ণাঙ্গ জরিপ প্রয়োজন, কিন্তু এখনো মাতামুহুরী নদী সরকারি জরিপের আওতায় আসেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঐতিহ্যবাহী এই নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো অঞ্চলের পরিবেশ ও জনজীবনে।
স্থানীয় শিক্ষক ও কবি জয়নব আরা বেগম বলেন, আমি মাতামুহুরী নদীর উৎসস্থল পর্যন্ত গিয়ে যা দেখেছি তা ভয়াবহ। নদীর পাড়ের পাহাড়জুড়ে প্রতিবছর জুম চাষ ও বৃক্ষ নিধন হচ্ছে। ফলে পাহাড়ের মাটি ক্ষয়ে নদীতে পড়ছে। এই বিষয়ে অবিলম্বে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে মাতামুহুরী নদী মারাত্মক সংকটে পড়বে। তিনি বলেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাতামুহুরী নদী কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।