পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করার একটি অপপ্রয়াস ছিলো বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার বিকালে সেনানিবাসে আর্মি মাল্টিপারপাস হলে জাতীয় শহীদ সেনা দিবস উপলক্ষ্যে এক মতবিনিময় সভায় এই মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং স্বাধীনতা পরবর্তী দেশ গঠনের সেনা বাহিনীর রয়েছে উজ্জ্বল ইতিহাস। সেনাবাহিনী আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। আমি মনে করি, পিলখানার এই মর্মান্তিক ঘটনা ছিল আমাদের সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করার একটি অপপ্রয়াস।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পিলখানার ঘটনার পরিক্রমায় আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার কাঠামো দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। তাই বর্হি বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার কাঠামোকে আরো আধুনিক সময় উপযোগী এবং শক্তিশালী করা প্রয়োজন অবশ্যই এবং এই লক্ষ্যেই আমাদের সরকার কাজ করবেন সবসময়। একই সাথে শহীদ পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে তাদের সন্তানদের শিক্ষা চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি আমরা ব্যক্ত করেছি।
২০০৯ সালে পিলখানার ঘটনা নিহত শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, মাহে রমযান আমাদের সংযম এবং আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি তিনি যেন শহীদদের শান্তিতে রাখে, তাদের পরিবারের কে ধৈর্য ও শক্তি দান করেন এবং আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান সম্মুখে ন্যায় শৃঙ্খলা ও দায়িত্ব পথে পরিচালিত করেন।
সীমান্ত রক্ষা বাহিনীকে আধুনিক করার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের পর জনগণের রায়ে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। দেশের প্রশ্নে আমরা সীমান্ত বাহিনীকে আরো আধুনিক ও সুসংহত করবো। আমাদের সদস্যরা দেশপ্রেম ও পেশাগত উৎসর্গতায় সীমান্তে দায়িত্ব পালন করবে ইনশাআল্লাহ।
২৫ ফেব্রুয়ারি রক্তাক্ত হত্যাকান্ডের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, ২০০৯ সালের ২৫ এবং ২৬ ফেব্রুয়ারির নির্মম ঘটনা আমাদের জাতীয় জীবনে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। যার বেদনা সময় পেরিয়ে আজও বহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর পরে শহীদের স্মৃতি বিজড়িত এই প্রাঙ্গণে আজ আমার কণ্ঠ কিছুটা স্বাভাবিকভাবে ভারী হয়ে উঠছে। আমি কেবল একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয়, একজন সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে, একজন সহযোদ্ধার সন্তানের মতন আপনাদের সামনে আপনাদের সাথে উপস্থিত হয়েছি। ২০০৯ সালের সেই বিভীষিকাময় ঘটনায় ৫৭ জন মেধাবী ও দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪জন প্রাণ ঝরে গিয়েছিলো। প্রতিটি নাম একটি পরিবারের আলো যাওয়ার গল্প, প্রিয়জন হারানো বেদনা বিদুর অধ্যায়, একটি সন্তানের পিতৃহীন হওয়ার ইতিহাস, একটি স্বপ্নের অসমাপ্ত মহাকাব্য।
তিনি বলেন, আমি দেশের তত্ত্বাবধায়নের পরপরই বনানী সামরিক কবরস্থানে গিয়ে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করেছি, গত ১৭ বছরে আপনাদের দুর্বিষহ সংগ্রাম, অপরিসীম ত্যাগ আর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিচার না পাওয়ার নিদারুন যন্ত্রণা। আমি বিশ্বাস করি পিলখানার ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করা হবে আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঘটনাকে ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদেরকে হয়ত ক্ষমা করবে না। তাই সেনাবাহিনীও আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে বর্তমান সরকার ইনশাল্লাহ কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী শিখড় আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রথিত। ১৯৭১ সালের যেদিন চট্টগ্রামের কালুঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন সেদিন সেনাবাহিনীর সাথে তদান্তনীন ইপিআর সদস্যবৃন্দ বেতার কেন্দ্রের দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্ন থেকে সেনাবাহিনীর সাথে অবিস্মরনীয় অবদান রেখে চলেছেন। পরবর্তীকালে শহীদ জিয়াউর রহমান সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সুসংহত করতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় সমস্যায় কাজ করেন। সেনাবাহিনী থেকে যোগ্য ও মেধাবী অফিসারদের পেষনে প্রেরণের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৭৮ সালে এই বাহিনীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা হল সামরিক কায়দায় নতুন করে পুনর্গঠিত করা। পূর্বের উইক সমূহকে পরিবর্তন করে ব্যাটেরিয়নে রূপান্তর করা হয়। দুটি নতুন ব্যাটেরিয়ান সংযোজন করে বাহিনীর সংগঠনকেও পরিবর্ধিত করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীসহ পিলখানায় নিহত শহীদ পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এটিএ শামসুল ইসলাম, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, প্রধানমন্ত্রীর মূখ সচিব এবিএম আবদুস সাত্তারসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সহধর্মিনী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জায়মা রহমানও ছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যরা শহীদ পরিবারের সাথে ইফতার করেন।