‘আয়নাঘর নামে যে ঘরে আমাকে বন্দী রাখা হয়েছিল তার দেয়ালে কোনো আয়না ছিল না।’ আসামীপক্ষের আইনজীবীর প্রশ্নে এমন কথা উল্লেখ করেছেন জেআইসিতে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে হাসিনুরকে জেরা করেন আজিজুর রহমান দুলু। ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
দ্বিতীয় দিনের মতো গতকাল হাসিনুর রহমানের জেরা অনুষ্ঠিত হয়। ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকীর হয়ে আইনি লড়াই করেন আইনজীবী দুলু।
জেরার একপর্যায়ে হাসিনুরের বিএ নম্বর জানতে চান আসামীপক্ষের আইনজীবী। জবাবে দুলু বলেন, আমার বিএ-২৬১১। আমি দশম বিএমএ লং কোর্সে কমিশনপ্রাপ্ত। কোর্ট মার্শাল রায়ের পর আমার বিএ নম্বর বাংলাদেশ আর্মির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিএমএইচসহ ইত্যাদিতে সাসপেন্ড কিনা জানি না। তবে আমার বিএ নম্বর সংক্রান্ত নথিপত্র সেনাসদরে নেই। শুনেছি ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কার কাছে শুনেছি মনে নেই।
এরপর তার ঠিকানা প্রসঙ্গে জানতে চান দুলু। তিনি বলেন, আমার বর্তমান ঠিকানা ২০২২ সালের জুন মাস থেকে বসবাস করছি। তাই মামলায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে লিখিত কোনো সমন বা নোটিশ পাইনি। তবে মৌখিকভাবে সময়-তারিখসহ সাক্ষীর জন্য হাজির হতে বলেছেন প্রসিকিউটর উদয় তাসমির। এ সময় আইনজীবী বলেন, আপনি প্রসিকিউশনের শেখানো মতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। জবাবে সত্য নয় বলে জানান সাক্ষী।
এরপর হাসিনুরকে প্রশ্ন করা হয়, প্রথম দফায় গুমের পর কত তারিখে আপনাকে অফিসার্স সেলে রাখা হয়েছিল। প্রতুত্তরে তিনি বলেন, প্রথম দফায় গুমের পর আমাকে যে তারিখে অফিসার্স সেলে আটক রাখা হয়, সেই তারিখ মনে নেই। ওই সময় আমাকে ৪৩ দিন গুম রাখা হয়।
এরপর তার পদোন্নতি নিয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় হাসিনুর বলেন, আমি ক্রমান্বয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদ থেকে লেফটেন্যান্ট, ক্যাপ্টেন, মেজর ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে নির্ধারিত সময়ে পদোন্নতি পাই। মেজর হিসেবে আমি মিলিটারি পুলিশে পদায়িত হই। লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে থাকাকালীন বিডিআরের দুটি রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। র্যাব-৫ ও ৭-এর অধিনায়ক ছিলাম।
দ্বিতীয় দফায় গুমের পর ডিজিএফআইয়ের সদর দপ্তর বা ভবনে গিয়েছিলেন কিনা; আইনজীবীর এমন প্রশ্নে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গুম থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত আমি ডিজিএফআই ভবনে যাইনি। চব্বিশের ৫ আগস্ট পর ডিজিএফআইয়ের ডিজির ভবনে একবার গিয়েছি। আর আয়নাঘরে একবার গিয়েছি প্রসিকিউটরের সঙ্গে। তবে ৫ আগস্ট ডিজিএফআই এলাকায় গিয়েছি বন্দীদের উদ্ধারের জন্য।
সাক্ষীর উদ্দেশে আইনজীবী দুলু বলেন, ডিজিএফআইয়ের কয়টি ব্যুরো রয়েছে। জবাবে হাসিনুর বলেন, তা আমি জানি না। সিআইবির নামও শুনিনি। এছাড়া প্রথম দফায় যে ৪৩ দিন আর্মি ইন্টারোগেশন সেলে বন্দী ছিলাম। তার পুরো সময় চোখ বেঁধে রাখা হতো। বাথরুমে যাওয়ার সময় চোখ খুলে দিতো। তবে হাতে হাতকড়া লাগানো থাকতো। ওই সময় আমাকে মাঝেমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
আয়নাঘরে কয়টি সেল ছিল; এমন প্রশ্নে এই সাক্ষী বলেন, আয়নাঘরে অবস্থিত ১০টা সেল, যার একটিতে আমাকে বন্দী রাখা হয়েছিল। এগুলোকে রিমান্ড সেল বলা হতো। জিজ্ঞাসাবাদের সময় জমটুপি পরানো হতো।
এ সময় প্রশ্ন ছুড়ে দুলু বলেন, কীভাবে আয়নাঘর শব্দটি এলো। তখন হাসিনুর রহমান বলেন, নেত্র নিউজের এডিটর ইন চিফ তাসনিম খলিলের মাধ্যমে আয়নাঘর শব্দটি মিডিয়ায় প্রথম প্রচারিত হয়।
এরপরই আয়নাঘরে কোনো আয়না দেখতে পেয়েছিলেন কিনা জানতে চান আসামীপক্ষের আইনজীবী। উত্তরে সাক্ষী বলেন, আয়নাঘর নামে যে ঘরে আমাকে বন্দী রাখা হয়েছিল, তার দেয়ালে কোনো আয়না ছিল না। তবে আমাকে যে বন্দীশালায় রাখা হয়েছিল তাকে যে আয়নাঘর নামে ডাকতো তা আমি প্রথমে তাসনিম খলিলকে বলি।
এছাড়া গুমের সময় রাখা কক্ষের বর্ণনা নিয়েও প্রশ্ন করেন দুলু। তখন সাক্ষী বলেন, জবানবন্দীতে আমি যে কক্ষের উচ্চতা ১৬-১৮ ফুট বলেছি। সেই কক্ষের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১০-১২ ফুট ও প্রস্থ আনুমানিক ৮-১০ ফুট।
তখন আইনজীবী বলেন, আপনি দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ সম্পর্কে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন। জবাবে সত্য নয় বলে জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান।
এর আগে, মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ট্রাইব্যুনালের সামনে অবশিষ্ট সাক্ষ্য সম্পন্ন করেন গুমের শিকার সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। তার জবানবন্দী শুরু হয় ২৫ জানুয়ারি। তিনি এ মামলার দুই নম্বর সাক্ষী। প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী।
এদিকে, আজও এ মামলায় গ্রেপ্তার তিনজনকে ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তারা হলেন- ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।
এছাড়া পলাতক ১০ আসামীর পাঁচজনই ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
অন্যরা হলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এসবের সময়কাল হলো ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত। এ সময়টায় গুম হন ২৬ জন।
যাত্রাবাড়ীতে তাইম হত্যা মামলা
হাবিবসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে : চার্জ গঠনের আবেদন জুলাই অভ্যুত্থানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ইমাম হাসান তাইম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষ করেছে প্রসিকিউশন। আসামীপক্ষের শুনানির জন্য আগামী ২ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। অপর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আসামীদের অভিযোগ গঠন নিয়ে ট্রাইব্যুনালে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। শুনানিতে যাত্রাবাড়ীতে তাইম হত্যার পুরো বিবরণসহ ১১ আসামীর ব্যক্তিগত দায় তুলে ধরেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীসহ ঊর্ধ্বতন অন্যান্য কর্মকর্তার নির্দেশে খুব কাছ থেকে গুলী চালিয়ে নির্মমভাবে তাইমকে হত্যা করা হয়। এমনকি গুলীবিদ্ধ অবস্থায় তাকে বাঁচাতে পেছন দিয়ে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন তার বন্ধু রাহাত। তখন তাকেও গুলী চালিয়ে তাইমকে ফেলে রেখে যেতে বাধ্য করে পুলিশ। মর্মান্তিক এ দৃশ্য সেই সময় সবার অন্তরে নাড়া দিয়েছিল।
এছাড়া আসামীদের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ, উসকানি-প্ররোচনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। সবমিলিয়ে প্রাইমা ফেসি বিবেচনায় ১১ আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর। পরে গ্রেপ্তার দুই আসামীর পক্ষে শুনানির জন্য সময় প্রার্থনা করেন আইনজীবী আবুল হাসান।
এছাড়া পলাতক ৯ আসামীর পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম ও লোকমান হাওলাদারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
এদিকে, গতকাল সকালে কারাগার থেকে এ মামলার দুই আসামীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও তৎকালীন ওসি (তদন্ত) জাকির হোসেন।
হাবিবুর ছাড়া পলাতক অন্যরা হলেন, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারি জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন, এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান ও মো. শাহদাত আলী।
এর আগে, ২৪ ডিসেম্বর ১১ আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২। একইসঙ্গে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ওই দিন তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন ২০২৪ সালের ২০ জুলাই পুলিশের গুলীতে শহীদ হন তাইম। তার বাবা মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়াও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উপ-পরিদর্শক। ওই দিন বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলী খেয়ে লাশ হয়ে ফিরতে হয় তাকে।
খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ছেলের লাশ পেয়ে ফোনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ময়নাল বলেন, 'স্যার, আমার ছেলেটা মারা গেছে। বুলেটে ওর বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। স্যার, আমার ছেলে আর নেই। এ সময় প্রশ্ন রেখে বলেছিলেন, একজনকে মারতে কতগুলো গুলী লাগে স্যার।