# হাসপাতালে এসেছেন প্রধান উপদেষ্টা জামায়াত আমীর ও তিনবাহিনী প্রধান

# গুজবে কান না দেয়ার অনুরোধ বিএনপির

# উৎকন্ঠা-ভিড় বাড়ছে নেতাকর্মীদের অশ্রুসিক্ততা

বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়েই রয়েছে। বিশেষ করে তার হৃদ্যন্ত্র, লিভার, কিডনি ও ফুসফুসের জটিলতা কাটছেই না। চিকিৎসকরা বলছেন, চিকিৎসায় এ সমস্যাগুলোর একটির সামান্য উন্নতি হলে অন্যটির অবনতি ঘটছে। যা গত কয়েক দিন ধরে উদ্বেগজনকভাবে নানা মাত্রায় ওঠানামা করছে। চিকিৎসকরা এখনো এইজন্য আশাবাদী যে, খালেদা জিয়াকে যে চিকিৎসা তারা দিচ্ছেন, তিনি তা গ্রহণ করতে পারছেন। ওষুধ কাজ করছে।

এদিকে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থানে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অব্যাহত রয়েছে। দেশের বাইরেও তার রোগমুক্তি কামনায় দোয়ার আয়োজন করা হচ্ছে। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সবশেষ খবরাখবর জানতে হাসপাতালে গেছেন প্রধান উপদেষ্টা, অন্যান্য উপদেষ্টা, জামায়াত ইসলামীর আমীর, তিন বাহিনী প্রধানগণ দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও দলীয় নেতারা। হাসপাতালের সামনে দিনরাত ভীড় করছেন নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। সবার একটাই জিজ্ঞাসা, কেমন আছেন তাদের প্রিয় নেত্রী-মানুষ। তারা কি আবারো শুনতে পাবে বেগম জিয়ার সেই আপোষহীন বার্তা।

দেশের একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস হাসপাতালের চিকিৎসক এবং লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের অধীনে বর্তমানে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। জানা গেছে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যুক্তরাজ্য থেকে একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল গতকাল সকালে ঢাকায় এসে পৌঁছেছে। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত এই চিকিৎসকেরা তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের পরামর্শের ওপর নির্ভর করবে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চলবে, না কি লন্ডনে নেওয়া হবে। এ ছাড়া চীন থেকে আরও একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল গতকাল বিকেলে ঢাকায় এসেছে বলে জানা গেছে। যদিও ইতোমধ্যে দেশটির চিকিৎসকদের পাঁচ সদস্যের একটি অগ্রবর্তী দল ঢাকায় রয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্যতম এ জেড এম জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, কাতার, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও ভারত খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ইতোমধ্যে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে।

খালেদা জিয়ার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে গতকাল দুপুরে হাসপাতালের ফটকে জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে ডাক্তাররা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন, সেই চিকিৎসা উনি (খালেদা জিয়া) গ্রহণ করতে পারছেন অথবা আমরা যদি বলি উনি মেনটেইন করছেন। যদিও কয়েক দিন ধরে সিসিইউতে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা গুজব চলছে। অনেকে তার অবস্থা ‘জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে’ বলে রটাচ্ছেন। তবে যেকোনো ধরনের গুজব ছড়ানো এবং গুজবে কান না দেওয়ার জন্য খালেদা জিয়ার পরিবার এবং দলের পক্ষ থেকে বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন ডা. জাহিদ।

বিএনপির এই নেতা বিদেশি চিকিৎসকদের ঢাকায় আসার কথা জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ মুহূর্তে তাকে দেশের বাইরে নেওয়ার সুযোগ নেই। জাহিদ হোসেন জানান, খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে নেওয়ার জন্য দলের সব প্রস্তুতি আছে। রোগীর বর্তমান অবস্থা এবং সর্বোপরি মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শের বাইরে কোনো কিছু করার সুযোগ এই মুহূর্তে তাদের হাতে নেই।

চিকিৎসায় বিদেশী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক :এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে যুক্তরাজ্য ও চীন থেকে এসেছে দুটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল। গতকাল সকালে যুক্তরাজ্য আর সন্ধ্যায় চীনের চিকিৎসক দলের সদস্যরা ঢাকায় এসে পৌছে। বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য থেকে আসা চার সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিম হাসপাতালে পৌঁছেছে। এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন তারা। ড. রিচার্ড বিউলের নেতৃত্বে মেডিকেল প্রতিনিধি দলটি এভারকেয়ার হাসপাতালের চতুর্থ তলার সিসিইউতে প্রবেশ করেন। তারা খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করেন এবং হাসপাতালের স্থানীয় মেডিকেল টিমের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্যের এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশে এসেছে। স্থানীয় চিকিৎসক দলের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তারা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, বিদেশি বিশেষজ্ঞরা আসায় খালেদা জিয়ার চিকিৎসার অগ্রগতি হবে আশা করা হচ্ছে।

হাসপাতালে প্রধান উপদেষ্টা : রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে হাসপাতালে গেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল সন্ধ্যা ৭টা ৭ মিনিটে প্রধান উপদেষ্টা এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। এসময় সেখানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উপস্থিত ছিলেন ।বিএনপির চেয়ারর্পাসনের মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান জানান, মহাসচিব প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে সরাসরি চেয়ারপার্সনের কাছে নিয়ে গেছেন। এসময় আরও ছিলেন অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও অধ্যাপক ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদার। জানা গেছে, প্রায় আধ ঘণ্টা হাসপাতালে অবস্থান করে বিএনপি চেয়ারপার্সনের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন প্রধান উপদেষ্টা। এসময় তিনি বেগম জিয়ার চিকিৎসায় সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরণের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে জানান। তিনি তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।

এদিকে সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার আগমন উপলক্ষে হাসপাতাল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ), প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তা জোরদার করেন। এ সময় কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় হাসপাতালের প্রধান ফটক।

হাসপাতালে জামায়াত আমীর : গুরুতর অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে মঙ্গলবার রাতে দেখতে এসেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। রাত সাড়ে ১০টার পর হাসপাতালে পৌঁছান জামায়াত আমীর। পৌনে ১১টার দিকে বের হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাংবাদিকদের কাছে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলেন, খালেদা জিয়ার সংকটজনক শারীরিক অবস্থার খবরে বহুদিন দূর থেকেই ধৈর্য ধরে দোয়া করছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর মনকে থামাতে পারেননি তিনি, সবশেষে তাই এভারকেয়ার হাসপাতালে ছুটে এসেছেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজকে আর কোনোভাবে মনকে বোঝাতে পারিনি, এজন্যই আসলাম। আমি উনাকে দেখে এসেছি। খালেদা জিয়ার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে তিনি জানান, এখন উনার ডায়ালাইসিস চলছে এবং তিনি আসলে ডিপ সিডেশনে (এক প্রকার চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে ওষুধ ব্যবহার করে রোগীকে গভীর ঘুমে রাখা হয়) আছেন। সারা দুনিয়ার মানুষের সঙ্গে আমরাও দোয়া করি আল্লাহ তাআলা উনাকে সুস্থতার নিয়ামত দান করুন।

শারীরিক জটিলতা নিয়ে খালেদা জিয়ার বহুদিনের চিকিৎসা প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সবাই জানি বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। এভারকেয়ারে এর আগেও বহুবার এসেছেন, কিন্তু এবারের মতো এত সংকটজনক পরিস্থিতি আগে হয়নি। নিজে এতদিন হাসপাতালে না গিয়ে দূর থেকে দোয়া করার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আমি ধৈর্য ধরছিলাম। দোয়া করছিলাম বাহির থেকে। মনে হচ্ছিল এখানে এসে ডিস্টার্ব না করি।

এ সময় তিনি বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া অনুরোধের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। জামায়াত আমীর বলেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও আহ্বান জানিয়েছিলেন দোয়া করুন, এসে ভিড় করবেন না। এতে উনার চিকিৎসা বিঘিœত হচ্ছে, অন্য রোগীদের চিকিৎসাও ব্যাহত হয়।

খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য তিনি আবারও দোয়া করে বলেন, আমি দু’চোখে একটু দেখে আসতে পেরেছি এটাই আমার সান্ত¡না। তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন, জাতির খেদমতে বাকি জিন্দেগিটা কাটাতে পারেন এই দোয়া করি।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আল্লাহ জীবিতকে তুলে নিতে পারেন, আবার মৃতকেও ফিরিয়ে দিতে পারেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন জানান, যেহেতু খালেদা জিয়া এখনো সারভাইভ করছেন, আল্লাহ চাইলে তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। তিনি খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা, পরিবারের প্রতি ধৈর্যের বার্তা এবং হাসপাতালের শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।

তিনি জানান, খালেদা জিয়ার পরিবারের জন্য এই সময়টা অত্যন্ত কঠিন। ডা. শফিক বলেন তার পরিবারের সদস্যদের এই পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা খুব কষ্টের। আল্লাহ যেন তাদের মনকে শক্ত রাখেন এমন দোয়া করেন তিনি। এভারকেয়ারের চিকিৎসা পরিবেশ ও নিয়মের বিষয়টি সামনে এনে জামায়াত আমীর বলেন, এখানে হাসপাতালের যে ডিসিপ্লিন, এটার ক্ষেত্রে আমাদের কারোই ব্রেক করা উচিত না। আমি মাত্র দেড় মিনিট দাঁড়িয়েছি। আমার দায়িত্ববোধ বলছে, সুযোগ থাকলেও বেশি সময় দাঁড়ানো ঠিক নয়। তিনি আরও বলেন, আমি দু’চোখে উনাকে দেখে এসেছি।

হাসিনা দায়ী : বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, খালেদা জিয়ার অসুস্থতা শেখ হাসিনার কারণেই। গতকাল বুধবার রাজধানীর নয়াপল্টনে রোগমুক্তি কামনায় কৃষক দল আয়োজিত দোয়া মাহফিলে এ কথা বলেন তিনি। রিজভী বলেন, যিনি নিজের মাটি, দেশ, জনগণ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করেননি, তার প্রতি সবার ভালোবাসা থাকবেই। সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাচ্ছি। কখনো কখনো অন্যায় আবদার করা হয়েছে, দেশের স্বার্থে বেগম জিয়া মেনে নিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো মানুষ যেন হত্যা না হয় সেজন্য ৯৬’র ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

যারা হত্যাযজ্ঞ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এনেছিল তারাই ক্ষমতায় এসে সেটা বাতিল করেছে উল্লেখ করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, জনগণের ওপর বিশ্বাস না রেখে নিজের ইচ্ছামতো দেশ চালিয়েছেন শেখ হাসিনা। অথচ ১৯৯৫-৯৬ সালে বাস-ট্রাক পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলেছিলেন তিনি। বেগম জিয়ার অসুস্থতা ওই হাসিনার কারণেই।

নেতাকর্মীদের অশ্রুসিক্ততা : খালেদা জিয়াকে দেখতে গিয়ে গতকাল বিএনপির কয়েকজন নেতাকে অশ্রুসিক্ত হয়ে হাসপাতাল থেকে বের হতে দেখা গেছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রতিদিন একাধিকবার হাসপাতালে যান। গতকাল বিকেলে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় তাকে অশ্রুসিক্ত দেখা যায়। এর আগে দুপুরের দিকে হাসপাতালের ফটকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন। একপর্যায়ে তিনিও কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথা বলেন। এ ছাড়া খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে যান সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম, গোলাম আকবর খন্দকারসহ মূল বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা।

এছাড়া আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ও নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যান।

উৎকন্ঠা-ভীড় বাড়ছে: রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার খবর নিতে দলের নেতা-কর্মী ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কর্মীর ভীড় বাড়ছেই। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের মধ্যেও চরম উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের সামনের সড়কে প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্মীদেরও উপস্থিতি ছিল আগের তুলনায় অনেক বেশি। এমন পরিস্থিতিতে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। বিএনপি হাসপাতালে ভিড় না করার জন্য নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তবু প্রতিদিনই হাসপাতালের সামনে ভিড় বাড়ছে। সেখানে তারা গণমাধ্যমগুলোতে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন।

দোয়া মাহফিল : দেশের বিভিন্নস্থানে খালেদা জিয়ার সুস্থতায় দোয়া মাহফিল অব্যাহত রয়েছে। বেগম জিয়ার দ্রুত সুস্থতা ও আরোগ্য কামনায় কোরআন খতম ও দোয়ার আয়োজন করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামিয়া ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসা মিলনায়তনে এর আয়োজন করা হয়। দোয়া মাহফিলে হেফাজত আমির বলেন, দেশের এই কঠিন সময়ে খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা প্রয়োজন। আল্লাহ যেন তাকে সম্পূর্ণ আরোগ্য দান করেন।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জিয়াউর রহমান সমাজ কল্যাণ পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে পুরো দেশই ব্যথিত মন্তব্য করে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেছেন, বাংলাদেশের এমন কোনো হৃদয় নেই যেখানে আজ খালেদা জিয়ার জন্য অশ্রু ঝরেনি, হাত তুলে প্রার্থনা করা হয়নি। দেশের বাইরে যেখানেই বাংলাদেশিরা আছেন- সেখানেও মানুষ তার জন্য দোয়া করছেন। এমন একজন মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি তার এই অবস্থায় মর্মাহত নন। আমি আমার নিজের মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিলাম। তখনও অশ্রু এতটা ঝরেনি- যতটা আজ খালেদা জিয়ার জন্য ঝরছে।

সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, বেগম খালেদা জিয়া সারাজীবন দেশ ও জনগণের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করতে গিয়ে তাকে নিষ্ঠুরভাবে ফ্যাসিস্ট শাসকদের হাতে নির্যাতিত হতে হয়েছে। এ নিযাতন এতটাই কঠোর ছিল যে তিনি অসুস্থ হয়েছেন এবং তার জীবন বিপন্ন অবস্থায় পড়েছে। দেশের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, তবুও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। মূলত তার উপস্থিতিই আগামীর প্রত্যাশিত গণতন্ত্রের জন্য বড় অনুপ্রেরণার শক্তি। তার এই অভিভাবকত্বকে সব রাজনৈতিক দল শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়াই রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতিশব্দ উল্লেখ করে ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার যে আপসহীন সংগ্রাম, সেটাই তাকে এই মুহূর্তে একজন অনিবার্য রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশের অভিভাবকে পরিণত করেছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোনে বিষেশভাবে তার অনিবার্যতা তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে তার উপস্থিতি খুবই দরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অসুস্থতার কারণে রাজনীতির মাঠে সশরীরে অনুপস্থিত থাকলেও তিনি এখনো দেশবাসীর আবেগ ও অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু।

বেগম খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করে বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়া রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে এত বছর ধরে দেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যুদ্ধ করেছেন। অনেক কষ্ট পেয়েছেন, জেলে গেছেন এবং অনেক কটুকথা শুনেছেন। কিন্তু তিনি পাল্টা প্রতিশোধ নেননি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি দেশ ছেড়ে যাননি।

উল্লেখ্য, গত ২৩ নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য গুলশানের বাসা ফিরোজা থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে আনা হয় খালেদা জিয়াকে। পরে মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে তাকে ভর্তি করা হয়। এরপর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। গত রোববার ভোররাতের দিকে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে এসডিইউ থেকে সিসিইউতে নেওয়া হয়।