দেশে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে গতকাল শনিবার পর্যন্ত ৫ শতাধিক মৃত্যু দেখলো দেশ। মার্চের পর থেকে একে একে ৫১২ জনের পরিবারের আশার আলো নিভে গেছে। হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। কিছুই যেন হার মানছে না এই সংক্রমণ। এরমধ্যে এলো ঈদুল আযহা। এতে নাড়ির টানে গ্রামে যাওয়া মানুষ একে অপরের সংস্পর্শে যাবে। এতে হামের সংক্রমণ আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকরা বলছেন, হামের টিকা নেওয়ার পর বা প্রাকৃতিকভাবে সংক্রমণের পর শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে এক থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। সেই হিসেবে টিকা পাওয়া শিশুদের শরীরে এতদিনে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিশুর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি তৈরি ধীরগতিতে হচ্ছে বা যথাযথভাবে হচ্ছে না। তীব্র অপুষ্টি, ডায়রিয়া, প্রোটিনের ঘাটতি এবং দুর্বল পুষ্টি পরিস্থিতির কারণে অনেক শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠছে না। ফলে তারা সহজেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে।
মার্চের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয় হামের প্রাদুর্ভাব। এরপরে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। একইসাথে বাড়তে থাকে মৃত্যুর সংখ্যাও। এরপরে তুলনামূলক কিছুটা কমতে শুরু করে রোগীর সংখ্যা। আবার যারা আসেন তারাও জরুরি চিকিৎসা নিয়ে চলে যেতে পেরেছেন বাড়িতে। তবে এখন আবার বাড়ছে ভর্তি রোগীর সংখ্যা।
হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পরে শ্যামলীর এই শিশু হাসপাতালে দুইটি ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেয়া হতো। পাশাপাশি ছিলো আইসিইউ। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়ার কারনে নতুন আরেকটি ওয়ার্ড হামের চিকিৎসায় যুক্ত করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে ওয়ার্ড বাড়ানোর পরেও অনেক রোগীই ফিরে যাচ্ছে সিট না পেয়ে।
হামে আক্রান্ত হওয়া সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে দিনের পর দিন কাটাচ্ছে বাবা-মায়েরা। চলছে চিকিৎসা। কিন্তু তবুও অভিভাবকদের মনে থেকেই যাচ্ছে আতংক। কবে সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন আছেন সেই অপেক্ষায়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ দেয়া তথ্য মতে, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার (২২ মে) সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ১৫ মার্চ থেকে পর্যন্ত হাম ও উপসর্গে ৪৯৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪১৪ জন। আর নিশ্চিত হামে ৮৫ জন মারা গেছে। এছাড়া উল্লেখিত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও এক হাজার ২৬১ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ দেখা দেয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৫৪০ জনে। এবং নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৩২৯ জন।
এদিকে আসছে ঈদের ছুটিতে এই আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা আরও বেড়ে যাওয়া আশংকা করছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ফলে এই ছুটিতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। ঈদের ছুটিতে হামের সতর্কতা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, ঈদের ছুটিতে বিশাল সংখ্যক মানুষ স্থানান্তরিত হবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। এদের মধ্যে যাদের শরীরে হামের জীবাণু রয়েছে এবং যাদের জ্বর হওয়ার একদিন দুদিন পার হয়েছে তারা কিন্তু অন্যদের মধ্যে হাম ছড়াতে পারে। কারণ হামের ফুসকুরি ওঠার চারদিন আগে এবং চারদিন পর পর্যন্ত এটি জীবাণু ছড়ায় ভাইরাস ছড়ায়। ফলে আমরা আশঙ্কা করছি ঈদ যাত্রার মধ্য দিয়ে হামের ভাইরাস আরো একটু বেশি ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে ঈদের পরে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি আরেকটি সম্ভাবনা রয়ে গিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ কারণে আমরা সবাইকে বলব যাদের পরিবারের কোন একজন অথবা একাধিক কারো জ্বর থাকে তাহলে তাদের উচিত অপেক্ষা করা সেটি হামে রূপান্তরিত হয় কিনা সেটি লক্ষ্য করা এবং একই সাথে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া।
ঈদযাত্রায় শিশুদের নিয়ে সতর্কভাবে চলার পরামর্শ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর
হাম সংক্রমণ এড়াতে ঈদের সময়ে শিশুদের নিয়ে সতর্কভাবে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। শনিবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া যন্ত্রপাতি ও স্যালাইন গ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ পরামর্শ দেন।
বাস ও ট্রেনযাত্রা এবং আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা আপনাদের অনুরোধ করছি, ঈদের সময় শিশুদের যেন সব জায়গায় নিয়ে না যাওয়া হয়। বিশেষ করে যেসব শিশুর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বা অতিরিক্ত ভিড় রয়েছে, এমন জায়গায় না নেওয়াই ভালো। তিনি বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের কাছ থেকে সুস্থ শিশুদের দূরে রাখতে হবে। একইভাবে আক্রান্ত রোগীদেরও অন্যদের সঙ্গে মিশতে দেওয়া উচিত নয়। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
দেশের হাম পরিস্থিতির অবনতির কারণ উদঘাটনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচওকে একটি ‘স্বাধীন তদন্ত’ করার জন্য অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে সরকার। এ বিষয়ে বৈশ্বিক এই সংস্থাটির কাছ থেকে ইতিবাচক জবাব পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি বলেন, আমরা কাউকে ঢালাও দোষারোপ করতে চাই না বা কাউকে এককভাবে দায়ও নিতে চাই না। তবে ভুলের যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য হাম পরিস্থিতি কেন এমন হলো সেটা জানা দরকার। সেজন্যই একটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনকোয়ারির জন্য ডব্লিওএইচওকে আমরা অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছি। তারাও আগ্রহ দেখিয়েছে।
এর আগে ইউনিসেফ ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছিল যে, হাম পরিস্থিতি নিয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে তারা অন্তত পাঁচটি চিঠি দিয়েছিল এবং এছাড়া বিভিন্ন বৈঠকে অন্তত ১০ বার সতর্ক করা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান ইউনিসেফের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রসঙ্গত, হামের টিকার স্বল্পতা মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন অভিযোগ করে অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করছেন। হাম উপসর্গে শত শত শিশুর মৃত্যুর জন্য দায়ীদের শাস্তি দাবি করে ঢাকায় নানা কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন। বিষয়টি গড়িয়েছে আদালত পর্যন্তও। সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবীর রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা তদন্তে কেন কমিশন গঠনের নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। তবে সম্প্রতি স্বাস্থ্য সচিব ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, টিকার সংকট এবং হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে সরকার। কেন এত শিশুর মৃত্যু হলো বা এক্ষেত্রে কারও কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।