প্রায় সাত দশক আগে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল আজও সংকট ও সমস্যা কাটিয়ে ঊঠতে পারেনি। ১ হাজার ২০০ শয্যার (বেড) এই হাসপাতালের জন্য কর্মরত রয়েছে মাত্র ৫৫০ বেডের সমান জনবল। এদিকে গত সাত মাসে এই হাসপাতালে নিবিড় চিকিৎসার ঘাটতির কারণে ২ হাজার ২৫৫ শিশুর মৃত্যু ঘটেছে বলে জানা গেছে।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, “এই হাসপাতালটি ১২০০ শয্যার হলেও ৫৫০ শয্যার জনবল নিয়ে এখানে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এখানে গড়ে প্রতিদিন হাসপাতালের ভিতরে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আর বহির্বিভাগে গড়ে সাত হাজার রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।” তিনি আরো জানান, বিশেষ ব্যবস্থাপনায় প্যাথলজি ও রেডিওলজি থেকে শুরু করে সকল প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে সীমিত জনবল দিয়েই। এখানে রোগীর চাপ ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। রাজশাহীর বাইরে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ আশে-পাশের সকল জেলা থেকে রোগী আসে। সেসব রোগীকে চিকিৎসা দিতে হয়। এই রোগীগুলো যখন আসেন, তখন অনেকেই কিন্তু জটিল পর্যায়ে থাকে। তার পরেও অনেকের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রয়োজনে কম থাকায় প্রয়োজনের তুলনায় তা দেয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেকেই অপেক্ষামান থাকায় অনাকাক্সিক্ষতভাবে খারাপ পরিণতির শিকার হচ্ছে।”
শিশু চিকিৎসায় সংকট
রাজশাহীর এই হাসপাতালে এই সময়ে শিশু চিকিৎসায় সংকট বিশেষ আলোচনায় এসেছে। যথাযথ নিবিড় পরিচর্যার অভাবে গত সাত মাসে মারা গেছে ২ হাজার ২৫৫টি শিশু। এর মধ্যেও চিকিৎসা নিয়েছে ২৮ হাজার ৪২৭ জন। মৃত শিশুদের মধ্যে নবজাতকই রয়েছে ৫ শতাধিক। এর বাইরে মারা গেছে হাম, নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত শ^াসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে। নবজাতক যেসব শিশু মারা গেছে, তাদের বেশিরভাগই অপুষ্টি এবং অপরিপক্কতার কারণে মারা গেছে। এই নবজাতকদের মায়েদের অধিকাংশই বাল্য বিয়ের শিকার হয়ে গর্ভধারণ করায় তাদের নবাজতকরা পুষ্টিহীন এবং অপরিপক্ক শিশুর জন্ম দিচ্ছেন। যার ফলে জন্মের পর পরই এক-চার দিনের মাথায় মারা যাচ্ছে অনেক শিশু। এর বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী অঞ্চলে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে নিউমোনিয়া ও হাম রোগ। এতে আরো বেশি শিশু মারা যাচ্ছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানায়। সার্বিকভাবে রামেক হাসপাতালে আশঙ্কাজনক হারে শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করেছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের মুখপাত্র চিকিৎসক শঙ্কর কে বিশ্বাস জানান, গত সাত মাসে (সেপ্টেম্বর-মার্চ) মোট ২ হাজার ২৫৫ জন শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। সর্বশেষ মার্চ মাসে মারা গেছে ৩০৪ জন। এই সাত মাসে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে চিকিৎসাধীন ছিল ২৮ হাজার ৪২৭ জন শিশু। গত সেপ্টেম্বরে চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ৭০ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৩৬ জন, অক্টোবরে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৯০১ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৪৪ জন, নভেম্বরে চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ১৯৯ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৪৩ জন. ডিসেম্বরে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৭৪৩ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩৬১ জন, জানুয়ারিতে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৭৩৫ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ২৭৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ২৫৭ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ২৯১ জন এবং মার্চের গতকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ৪ হাজার ৫২২ জন শিশুর মধ্যে মারা গেছে ৩০৪ জন।