রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, আগাম কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ আগের বছরের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। দেশে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২১ মে পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ১৭ জন। এ সময়ে মারা গেছেন পাঁচজন। যদিও বছরের শুরুতে রোগীর সংখ্যা কমতির দিকে ছিল, এপ্রিল থেকে আবার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে এখনই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার না করলে জুন, জুলাই ও আগস্টে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার জানিয়েছেন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ ২০-এর বেশি পাওয়া যাচ্ছে, যা উচ্চ ঝুঁকির ইঙ্গিত। এই সূচক মূলত প্রতি ১০০টি বাড়ি পরিদর্শনের মধ্যে কতটি পানির পাত্রে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়, তা নির্দেশ করে।

তার মতে, শুধু ঢাকা নয়—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায়ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে রাজধানীর আশপাশের এলাকাগুলোও এবার বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, শুধুমাত্র ফগিং বা স্প্রে করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কোথায় মশার লার্ভা জন্ম নিচ্ছে তা শনাক্ত করে উৎস ধ্বংস করতে হবে। পাশাপাশি কিউলেক্স ও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আলাদা পরিকল্পনা নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জমে থাকা পরিষ্কার পানিই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। বাসাবাড়ির টব, ড্রাম, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা ছাদে জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলতে না পারলে সংক্রমণ আরও বাড়বে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে বরিশাল ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায়। এরপর রয়েছে ঢাকা। মৃত পাঁচজনের মধ্যে তিনজন ঢাকার এবং দুজন চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর বাসিন্দা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক রোগ নিয়ন্ত্রণ পরিচালক ড. বেনজীর আহমেদ মনে করেন, এবার মূল উদ্বেগ হওয়া উচিত ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি। তার ভাষায়, বড় শহরগুলোতে কিছুটা হলেও মশক নিধন কার্যক্রম রয়েছে, কিন্তু ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে কার্যকর ব্যবস্থা এখনও দুর্বল।

তিনি বলেন, গত বছর রাজধানীর বাইরে ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছিল। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই এখন থেকেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা জরুরি।

ডেঙ্গুর ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ২০০০ সালের পর থেকে প্রায় প্রতি বছরই রোগটির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তবে ২০১৯ সালের পর পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়। বিশেষ করে ২০২২ ও ২০২৩ সালে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালে দেশে ১ লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং মারা যান ৫৭৫ জন।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে এবং নিয়মিত সমন্বয় সভা চলছে।