ঈদযাত্রায় বাড়বে হামের সংক্রমণ
একদিনে আরও ১৭ জনের মৃত্যু
কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না হাম সংক্রমণ। দিন দিন সংক্রমণ ও লাশের সারি বাড়ছে। মনে হচ্ছে মহামারির দিকে যাচ্ছে। এমন সময় ঈদ উদযাপন করতে যাচ্ছে মুসলিম জাতি। এই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে কোটি কোটি মানুষ দেশের একস্থান থেকে আরেক স্থানে যাচ্ছে এবং যাবে। তবে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এই যাত্রা সংক্রমণ বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।
ঈদুল আযহার ছুটি শুরু হয়েছে গতকাল সোমবার থেকে। তবে তার আগে থেকেই ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। এই যাত্রা আগামী বৃহস্পতিবার ঈদের আগের দিন পর্যন্ত চলবে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে ঈদের আগের তিন-চার দিনে কেবল ঢাকা থেকেই ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষ স্থানাস্তরিত হয়।
ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভিড়, মানুষের ব্যাপক চলাচল ও শিশুদের সংস্পর্শ বাড়ার কারণে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন ঈদের আনন্দের মধ্যেও এবার বাড়তি সতর্কতা জরুরি। এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সতর্ক বাতা হলো সারা দেশে হামের বিস্তার ঘটেছে, ঈদের ছুটির পর সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি ভাইরাসজনিত রোগ এবং এটি মূলত শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়। যে শিশু এখনো আক্রান্ত হয়নি, সে যদি এমন এলাকায় যায়, যেখানে আগে থেকেই হাম ছড়িয়ে আছে, তাহলে আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এসে সেও সংক্রমিত হতে পারে।
এর ব্যাখ্যায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমত, কোনো পরিবার এমন এলাকায় যেতে পারে, যেটি ইতিমধ্যে হামের ‘হটস্পট’। সেখানে গিয়ে সুস্থ শিশুও আক্রান্ত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত শিশু যদি লক্ষণ নিয়েই ভ্রমণ করে, তাহলে পথে বা গন্তব্যে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা মনে করেন, আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা বাড়ানো এখন সবচেয়ে জরুরি। তার মতে মা-বাবাকে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে মাস্ক ব্যবহার সব সময় সহজ নয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, শিশুর জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি বা শরীরে ফুসকুড়ির মতো লক্ষণ থাকলে তাকে নিয়ে ভ্রমণ না করাই ভালো। একই সঙ্গে ভিড়পূর্ণ পরিবেশ, অপরিচ্ছন্ন স্থান ও আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
হামে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি এরই মধ্যে বাতিল করে তাঁদের কর্মস্থল না ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। তবে এটা মূল সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক বে–নজির আহমদ। বে-নজির আহমদ বলেন, এভাবে চিকিৎসক ও নার্সদের নির্দেশ দেওয়াটাই সহজ পন্থা। একটা পরিপত্র জারি করলেই হলো। কিন্তু রোগটা যাতে না ছড়ায়, সেটি নিয়ে তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। সরকারের এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত নজরদারি বাড়ানো ও শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করার ওপর।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও উপসর্গে আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ২২৪ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ পাওয়া গেছে। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে সিলেট বিভাগে ৩ জন ছাড়াও রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে ২ জন করে মোট ৬ জনসহ ময়মনসিংহ বিভাগে হামের উপসর্গে একজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা বিভাগে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। সবমিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে সোমবার (২৪ মে) পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট ৫৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৭ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে আরও ১ হাজার ১২৭ জনের মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে সোমবার পর্যন্ত মোট ৬৪ হাজার ৯৪০ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে মোট ৮ হাজার ৭১৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে সোমবার পর্যন্ত সারাদেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৫১ হাজার ৫৮৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৪৭ হাজার ৬১৯ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন।