মানবদেহের নীরব অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি। প্রতিদিন প্রায় ১৮০ লিটার রক্ত পরিশোধন করে শরীর থেকে বিষাক্ত বর্জ্য অপসারণ, পানির ভারসাম্য রক্ষা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ হরমোন উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই অঙ্গটি। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো—বিশ্বজুড়ে কিডনি রোগ দ্রুত বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা নীরবে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার পালিত হয় বিশ্ব কিডনি দিবস। কিডনি রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদার করাই এ দিবসের মূল লক্ষ্য।

বিশ্বব্যাপী বর্তমানে প্রায় ৮৫ কোটির বেশি মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। এ তথ্য প্রকাশ করেছে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব নেফ্রলজি এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা । বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এর প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় স্পষ্ট থাকে না। ফলে রোগটি ধীরে ধীরে জটিল অবস্থায় পৌঁছে যায়।

কিডনি রোগের প্রধান ধরন

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কিডনি রোগের বিভিন্ন ধরন রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ বা ক্রনিক ক্রনিক কিডনি ডিজিস । এতে ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং শেষপর্যন্ত কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ এই রোগের প্রধান কারণ।

হঠাৎ কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে তাকে বলাহয় Acute Kidney Injury। পানিশূন্যতা, সংক্রমণ বা বিষাক্ত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এ ছাড়া অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় Kidney Stones বা কিডনিতে পাথর। এতে তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত এবং বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।

কিডনির ক্ষুদ্র ফিল্টারে প্রদাহজনিত রোগ এবং বংশগত রোগ -ও অনেক সময় গুরুতর কিডনি সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কেন বাড়ছে কিডনি রোগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক জীবনযাপন কিডনি রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, ধূমপান এবং পর্যাপ্ত পানি না পান করা—এসবই কিডনি ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়।

বাংলাদেশেও কিডনি রোগ একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী দেশে প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি সমস্যার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে Kidney Foundation Bangladesh।।

প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর পথ

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি রোগের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সুস্থ কিডনির জন্য প্রয়োজন—

প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান

লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া

নিয়মিত শরীরচর্চা

ধূমপান পরিহার

রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা

একই সঙ্গে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—বিশেষ করে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং প্রস্রাব পরীক্ষা—কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে সহায়তা করে।

তথ্যবক্স:

কিডনি সুস্থ রাখার ৭টি উপায়

১. প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান

২. লবণ ও ফাস্টফুড কম খাওয়া

৩. ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা

৪. নিয়মিত শরীরচর্চা করা

৫. ধূমপান ও তামাক বর্জন

৬. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ না খাওয়া

৭. বছরে অন্তত একবার কিডনি পরীক্ষা করা

শেষকথা

কিডনি রোগ অনেক সময় নীরবে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই বিশ্ব কিডনি দিবসের বার্তা একটাই—কিডনির যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন।

সূত্র

World Health Organization

International Society of Nephrology

Kidney Foundation Bangladesh

National Kidney Foundation

ডিএস/এমএএইচ