প্যারিস থেকে মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম :
আন্তর্জাতিক নারী অধিকার দিবস উপলক্ষে রোববার (৮ মার্চ) ফ্রান্সজুড়ে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানী প্যারিসেও এদিন বড় আকারের একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
বিকেল ২টায় প্যারিসের স্টালিনগ্রাদ এলাকা থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে প্লাস দ্য লা রেপুবলিক- এর দিকে অগ্রসর হয়। গার দ্য নর হয়ে মিছিলটি ফোবুর সাঁ-মার্তাঁ, রু লাফায়েত এবং বুলভার মজঁতা অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছায়।
নারীর নিজের শরীরের ওপর স্বাধীন অধিকার, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে প্রায় একশটি সংগঠন এদিন ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচির আহ্বান জানায়। আয়োজকদের মতে, ইউরোপে চরম ডানপন্থার উত্থানের কারণে নারীর অধিকার হুমকির মুখে পড়ছে।
মিছিলকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। শনিবার রাত ১০টা থেকে রোববার রাত ৯টা পর্যন্ত মিছিলের পুরো রুটে গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত স্টালিনগ্রাদ, লাফায়েত, মজঁতা এবং বাসাঁ দ্য লা ভিলেত এলাকায় যান চলাচল বন্ধ রাখা হয় বলে প্যারিস পুলিশ প্রিফেকচার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে। বিকেল ৩টা থেকে “রিপাবলিক” মেট্রো স্টেশনও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
অন্যদিকে, ডানপন্থী চরমপন্থী সংগঠন নেমেসিস মূল মিছিলে আমন্ত্রণ না পাওয়ায় রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলে পৃথক সমাবেশের আয়োজন করে। সংগঠনটি প্যারিসের ১৬ অ্যারঁদিসমঁ’র প্লাস জ্যঁ লোরাঁ - এ একটি অবস্থান সমাবেশ করে।
মিছিলের আয়োজকদের একাংশ নেমেসিসকে মূল কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। তাদের অভিযোগ, সংগঠনটি নারীবাদকে ‘বর্ণবাদী উদ্দেশ্যে ব্যবহার’ করছে।
পুলিশ প্রিফেকচারের মতে, বিভিন্ন সমাবেশের আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে একদিকে মিছিল করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায় এবং অন্যদিকে জননিরাপত্তা বজায় থাকে।
গত বছর আয়োজক সংগঠন গ্রেভ ফেমিনিস্ত দাবি করেছিল, প্যারিসের মিছিলে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ এবং পুরো ফ্রান্সে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল। তবে প্যারিস পুলিশ প্রিফেকচারের হিসাব অনুযায়ী, সে সময় রাজধানীতে প্রায় ৪৭ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
এদিকে প্যারিসে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশি কমিউনিটি সলিডারিতে আজি ফ্রান্স (সাফ) আয়োজন করেছে “নারীকথা” শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠান। প্যারিসের ঐতিহাসিক রিপাবলিক চত্বর সংলগ্ন ‘বুজ দ্যু থাবাই’ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী নারী-উন্নয়ন, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও প্রজন্মের ভাবনার ওপর সমৃদ্ধ আলোচনার আয়োজন করা হয়।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মারসেলা হেন্ডারসন-পিল; যিনি নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগের ওপর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। অন্যান্য বক্তা ছিলেন প্যারিসের যুব কাউন্সিলর, নয়ন এনকে, এছাড়াও সংবর্ধিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কবি হাসনাত জাহান ও নীলুফার জাহান; যারা নারী-সংক্রান্ত সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন তাওহীদ আহমেদ, তাসনিয়া আন্জুম এবং রুমন আহমেদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শাহীন আহমেদ। আর বিশেষ শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ডা. জাহরিন নূপুর, ফারজানা আলম, শাহনাজ আক্তার ও বিদ্যুৎ মোরশেদ।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনার অংশ হিসেবে কবিতা আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট আবৃত্তিকার বাচিক শিল্পী মুনির কাদের এবং অনুষ্ঠান শুরুতে ফ্রান্স ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন জয়িতা বড়ুয়া, নবকুমার বড়ুয়া ও নবনীতা বড়ুয়া, যা অনুষ্ঠানটিকে আরও আবেগময় ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, এভাবে “নারীকথা” শুধু নারী দিবস উদযাপন নয়, বরং প্যারিসের বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে সাংস্কৃতিক বন্ধন ও শিক্ষামূলক সংলাপকে উৎসাহিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
তারা বলেন, সমাজ ও জাতির উন্নয়নে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে “পিতা-মাতার সহায়তা এবং শিশু সুরক্ষা: পুনর্বিবেচনামূলক অনুশীলন” শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নীলুফার জাহান ও হাসনাত জাহান-কে “সাফ নারী সম্মাননা” প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে তাঁদের জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রও প্রদর্শন করা হয়।