অবশেষে অবসান হতে চলেছে জ্বালানি তেলের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও ভোগান্তির। সরকার জ্বালানি তেল বিক্রির ওপর আরোপিত কড়াকড়ি বা ‘রেশনিং’ পদ্ধতি তুলে নেওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের যে দীর্ঘ সারি ছিল, সেই দৃশ্যপটে আসেনি কোনো পরিবর্তন। ভোর থেকেই পাম্পগুলোতে দেখা যায় তেল নিতে দীর্ঘ লাইন।

এমনকি অনেক পাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে যে তেল বিক্রির সীমা তুলে দেওয়ার পরও গ্রাহকদের আগের মতোই সীমিত পরিসরে তেল দেওয়ার।

এই কৃত্রিম সংকটের নেপথ্যে সরকারের ভুল নীতি, ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার লোভ নাকি জনআতঙ্ক দায়ী—তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

গত ৬ মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অজুহাতে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে সরকার। ডিপো থেকে সরবরাহ কমানোর পাশাপাশি খুচরা পর্যায়েও বেঁধে দেওয়া হয় সীমা।

নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, ব্যক্তিগত গাড়ি মাত্র ১০ লিটার এবং মোটরসাইকেল ২ থেকে ৫ লিটারের বেশি তেল পাবে না।

এই ঘোষণার পরপরই সাধারণ মানুষের মধ্যে তেল ফুরিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পাম্পগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ চাহিদার চাপ তৈরি হয়, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়।

পেট্রোল পাম্প মালিক সংগঠনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম এই পরিস্থিতির জন্য সরকারের ‘অযৌক্তিক রেশনিং পদ্ধতি’কে দায়ী করেছেন।

তিনি জানান, একটি বড় ট্যাংকারে সাড়ে ১৩ হাজার লিটার তেল নেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও রেশনিংয়ের কারণে তাদের মাত্র ৩-৫ হাজার লিটার তেল দেওয়া হচ্ছিল।

তিনি আরো বলেন, ‘দূর-দূরান্ত থেকে খালি ট্যাংকার পাঠিয়ে অল্প তেল আনা পাম্প মালিকদের জন্য বিশাল আর্থিক লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া সীমিত তেলের কারণে গ্রাহকদের সাথে পাম্প কর্মীদের হাতাহাতি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ায় অনেকে পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন।’

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সংকটের দায় এককভাবে সরকারের নয়। অনেক পাম্প মালিক আগেভাগে তেল মজুত করে চড়া দামে খোলা বাজারে বিক্রি করেছেন এবং বিপিসির নির্দেশনা অমান্য করে পছন্দের গ্রাহকদের বেশি তেল দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আপনি যদি পরিবারের খরচ ইচ্ছামতো করেন, তাহলে মাস শেষে মানিব্যাগে টাকা থাকবে না। সুতরাং বিপিসিকে এককভাবে দোষ দেওয়া ঠিক নয়।’

তবে জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিপিসির তথ্য প্রকাশে আরও কৌশলী হওয়া উচিত ছিল।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, ‘মজুতের সুনির্দিষ্ট তথ্য ঢালাওভাবে প্রচার করায় জনমনে প্যানিক তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, প্রকৌশলী ফরিদ হোসেন পাঠান মনে করেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা যখন অস্বাভাবিক হারে তেল তুলে নিচ্ছিলেন, বিপিসি তখনই ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।’

বর্তমানে রেশনিং তুলে নেওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সরবরাহ চেইনে সঠিক সমন্বয় এবং তদারকি না থাকলে ভবিষ্যতে আবারও এমন ভোগান্তির মুখে পড়তে পারে সাধারণ মানুষ।