সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান নিয়ে নোটিশ
মঙ্গলবার দুই ঘন্টা আলোচনা হবে
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে আলোচনার জন্য সংসদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর উত্থাপিত নোটিশ নিয়ে দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে সংসদে। অবশেষে তুমুল উত্তেজনার মুখেই আগামীকাল মঙ্গলবারের বৈঠকের শেষের দুই ঘণ্টা এ বিষয়ে আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণ করেন স্পীকারের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। এ সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরও বার বার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ কথা বলার জন্য দাড়িঁয়ে যান। স্পীকার উনাকে থামিয়ে দেন। রুলিং পাস হয়েছে বলে স্পীকার বার বার বলতে থাকলেও সংসদে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে স্পীকার বৈঠকের পরবর্তী কার্যক্রমে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আলোচনার জন্য বক্তাকে ফ্লোর দেন। তবুও উত্তেজনা থামেনি। পরে বিরোধী দলীয় নেতা ও চীফ হুইপের বক্তব্যের পর পরিবেশ শান্ত হয়।
গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে বির্তকের সৃষ্টি হয়। পরে মাগরিবের নামাযের পর বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদ মুলতবি রেখে আলোচনা করার জন্য নোটিশ উত্থাপন করেন। তারপর আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চীফ হুইপের বক্তব্যের পর স্পীকার সিদ্ধান্ত দেন।
এ সময় স্পীকারের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, এ বিষয়ে বিরোধী দলের নেতার বক্তব্য শুনেছি। তারপর আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনেছি। এ বিষয়ে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি ৬৫(২) অনুযায়ী আমাদেরকে তিন দিনের মধ্যে এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে। সে হিসেবে আগামী ৩১ মার্চ রোজ মঙ্গলবার দিনের সর্বশেষ বিষয় হিসেবে ২ঘণ্টা আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণ করছি।
তিনি একাধিকবার এ বিষয়টি বলেছেন। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দিতে দাঁড়ালে বিরোধী দলের সদস্যদের পক্ষ থেকে আপত্তি করা হয়। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি বিরোধীতা করছি না। আলোচনা করতে হলে নোটিশটি সংশোধন করে নিতে হবে।
তখন আরো উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্পীকার পরবর্তী কার্যসূচিতে চলে যান। তিনি বার বার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বসতে বলেন সেই সাথে একাধিকবার বলেন মঙ্গলবার আলোচনার জন্য সময় নির্ধাণ করা হয়।
বিরোধী দলের নেতার নোটিশ উত্থাপন
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "বিগত ২৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে সরকার গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কিনা তাহা যাচাইয়ের জন্য আদেশটি জারি করা হয়। বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইংরেজি তারিখ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটে 'হ্যাঁ' ভোট বিজয়ী হয়। জনগণ জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ ও জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবের পক্ষে তাদের রায় প্রদান করেন।
তিনি বলেন, গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট নিরঙ্কুশ বিজয়ের ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ দুটি শপথ পাঠ করতে আইনানুগভাবে বাধ্য। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত মাননীয় সংসদ সদস্যদের ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানান। উক্ত শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মাননীয় সংসদ সদস্যগণ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলেরÑ১১ দলীয় জোটের ৭৭ জন মাননীয় সংসদ সদস্য পৃথকভাবে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ পাঠ করেন।
তিনি আরো বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫-এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম অধিবেশনÑসংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের বিধান থাকলেও এখন পর্যন্ত তা করা হয়নি। জাতির প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের অচল অবস্থা সৃষ্টি করা কখনো কাম্য নয়। এমতাবস্থায় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ অধিবেশন সংক্রান্ত আলোচনার জন্য মাননীয় স্পিকারের প্রতি সংসদ মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করছি। আমার প্রস্তাব হচ্ছে সংসদ মুলতবি করে এই বিষয়ে আলোচনায় দেওয়া হোক।"
আলোচনার বিষয়ে আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, যে বিষয়টি মুলতবি প্রস্তাব আকারে আনা হয়েছে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে, আমি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী একটি প্রস্তাবনা মনে করছি। এ বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। উনাদের পক্ষ থেকেও আলোচনা হবে, আমাদের পক্ষ থেকেও আলোচনা হবেÑআমরা আলোচনা করতে চাই। তবে আলোচনার আগে একটু সময় প্রয়োজন যে কারণে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিÑএই সাবজেক্টের উপর আলোচনা করতে গেলে প্রত্যেক সংসদ সদস্যর টেবিলের সামনে বাংলাদেশের সংবিধান, জুলাই সনদ, এই বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট সংক্রান্ত বইপত্র রাখতে হবে। তিনি বলেন, "জি, আমি সচিব মহোদয়কে অনুরোধ করব যেন আগামী সোমবারের মধ্যে এই ৪টি ডকুমেন্টের হার্ডকপি এবং প্রয়োজনে ডিজিটাল কপি প্রত্যেক সদস্যর কাছে সরবরাহ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আপত্তি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এমন কোনো প্রস্তাব নিয়ে আপনি আলোচনা আনতে পারবেন না, যে প্রস্তাবে প্রতিকার কেবল আইন প্রণয়নের মাধ্যমে হতে পারে। এখানে এটার প্রতিকার তো সংবিধান সংশোধন এবং আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই হবে। ইট ইজ নট সিম্পল ডিবেট অন দি রিসেন্ট ইস্যুজ আউটসাইড দি হাউস অর পাবলিশড ইন এনি পেপার। যে সমস্ত বিষয়ে আলোচনা হয়, সাধারণত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা অবনতি হয়েছেÑএ সমস্ত বিষয়ে কোনো ঘটনা নিয়ে মুলতবি প্রস্তাব সাধারণত হয়। ইট ইজ দি ট্র্যাডিশন অফ দি পার্লামেন্ট। হয় কি হয় না সেটা পরে, কিন্তু উত্থাপিত হয়। আমার জীবনে খুব কম দেখেছি আমি মুলতবি প্রস্তাব একসেপ্ট হয়েছে বা উত্থাপিত হয়েছে বা আলোচিত হয়েছে বা ভোটে গৃহীত হয়েছে। কিন্তু এটা তো আইন প্রণয়নের সাথে জড়িত। আপনি বিধি ৬৩-তে দেখেন, যে বিধিটা ৬৩-তে বলা আছে যে বিষয়গুলো আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই সমাধান হতে পারে, সে সমস্ত কোনো বিষয় জরুরি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে মুলতবি প্রস্তাবের জন্য আসতে পারে না। এখানে আমার ফেয়ার প্রপোজাল আছে।
তিনি বলেন, আমার প্রপোজাল আছেÑআমরা সংবিধান সংশোধন করতে চাই, আমার বিরোধীদলীয় সদস্য কেউ কেউ সংস্কার করতে চান। পার্লামেন্টের ল্যাঙ্গুয়েজ হচ্ছেÑকনস্টিটিউশন হয় প্রণীত হবে, অথবা রহিত হবে, অথবা স্থগিত হবে, অথবা সংশোধিত হবে। আমরা এখানে সোভারেন পার্লামেন্টে এখতিয়ার নিয়ে এসেছি সোভারেন জনগণের। আমরা এনাক্টমেন্ট করতে পারব, আইন প্রণয়ন করতে পারব এবং সংবিধানও একটি আইনের মাধ্যমে, বিলের মাধ্যমে এসে সংবিধান সংশোধন হবে। সুতরাং সংবিধান সংশোধনের জন্য লেট আস ফর্ম এ কনস্টিটিউশন রিফর্ম কমিটি হেয়ার। পজিশন এবং অপজিশন সবগুলোকে নিয়ে, সবাইকে নিয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য আমরা কাজ করি। এবং আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে জুলাই জাতীয় সনদ, যেটা জাতির সামনে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সবাই স্বাক্ষর করেছেনÑএকটা ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। আমি এটার বিরোধিতা করছি না এজন্য যে দলিলের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন হয়ে যায়নি, সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তন হয়ে যায়নি, কোনো অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে সংবিধানের কোনো কিছু ডিলিট হয়ে যায়নি। সেটা জায়েজ আছে, কিন্তু প্রস্তাব করা যায়। এটা হচ্ছে সেই প্রস্তাবÑজুলাই জাতীয় সনদÑযে পরবর্তী পার্লামেন্টে, সংসদে সবাই রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে এটা অনুযায়ী আমরা সংবিধান সংশোধন করব। এবং যে সমস্ত রাজনৈতিক দল ম্যানিফেস্টোতে অন্যান্য বিষয় উল্লেখ করেছে, সেই ম্যানিফেস্টো অনুযায়ী জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছেÑআমরা ৫১ শতাংশ ম্যান্ডেট পেয়েছি। আমরা সেই মতো আমাদের ইশতেহারে উল্লেখিত অন্যান্য বিষয়গুলো যেগুলো সংবিধানকে টাচ করবে সেখানে এগুলো আনতে পারব। এবং অন্যান্য বিষয়গুলো হয়তো আইন-কানুন পাস করে করা যাবে। যাই হোক, আমরা যেমন কৃষি ঋণ মওকুফ করেছি এটা আমাদের ম্যানিফেস্টোতে ছিল, ম্যান্ডেট ছিল এটা হয়েছে। এবং সেই কমিটি ইচ্ছা করলে পার্লামেন্ট এবং পার্লামেন্টের বাইরে দেশের সমস্ত সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং বিশিষ্ট জন, স্টেকহোল্ডার, পত্রিকার সম্পাদকসহ সকল সবাইকে আমরা ইনভাইট করে তাদের মতামত নেব। এবং আমরা জাতীয় ভিত্তিতে যেটা আমরা সম্মত হয়েছি যে জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছেÑউইথ নোট অফ ডিসেন্ট। যারা জনগণের ম্যান্ডেট প্রাপ্ত হয়েছে সেই নোট অফ ডিসেন্টগুলো ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ করার পরে সেই হিসেবে যাব। নাকি শুধুমাত্র আমরা এখানে ডিবেট করে মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করা হইল ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলে নাকচ হল সেখানে যাব? মেজরিটির ভিত্তিতে আমরা যেতে চাই না। আমরা সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে একটি এমন সংবিধান সংশোধন করতে চাই যে দলিলটা আমরা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের শহীদের আকাক্সক্ষাকে আমরা ধারণ করতে পারি। আমরা বাংলাদেশের মানুষের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সকল প্রত্যাশাকে ধারণ করতে পারি।
তিনি আরো বলেন, সেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদের আকাক্সক্ষা, প্রত্যাশা, জনপ্রত্যাশাÑবিরোধী দল এবং সরকারি দল সবাই মিলে, যারা সংসদের বাইরে আছে তাদেরও মতামতসহ নিয়ে আমরা এমন একটা দলিল রচনা করি যাতে করে আমরা অনেক দিন এই দলিলটা নিয়ে কাজ করতে পারি। অনেক দিন করার বলার কারণ হচ্ছেÑসংবিধান মানুষের প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে, সমাজের প্রয়োজনে, চাহিদা অনুযায়ী সময়ে সময়ে অবশ্যই কিছু কিছু বিধান পরিবর্তন করতে হয় সময়ের দাবি। সেজন্য আমরা একটা পারপেচুয়াল নেচারের অ্যামেন্ডমেন্ট করি যেটা অন্তত দীর্ঘ দিন পর্যন্ত আমাদের এখানে থাকবে। আমরা সেই সংবিধান নিয়ে এগোতে পারব।
স্পীকারের সিদ্ধান্ত
স্পীকারের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, এ বিষয়ে বিরোধী দলের নেতার বক্তব্য শুনেছি। তারপর আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনেছি। এ বিষয়ে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি ৬৫(২) অনুযায়ী আমাদেরকে তিন দিনের মধ্যে এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে। সে হিসেবে আগামী ৩১ মার্চ রোজ মঙ্গলবার দিনের সর্বশেষ বিষয় হিসেবে ২ঘণ্টা আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণ করছি।
তিনি একাধিকবার এ বিষয়টি বলেছেন। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দিতে দাঁড়ালে বিরোধী দলের সদস্যদের পক্ষ থেকে আপত্তি করা হয়। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি বিরোধীতা করছি না। আলোচনা করতে হলে নোটিশটি সংশোধন করে নিতে হবে।
তখন আরো উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্পীকার পরবর্তী কার্যসূচিতে চলে যান। তিনি বার বার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বসতে বলেন সেই সাথে একাধিকবার বলেন মঙ্গলবার আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়।
নোটিশ উত্থাপনের আগে বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্য
সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন নিয়ে নোটিশের বিষয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে নোটিশ প্রদান করার জন্য মাননীয় স্পীকার আমাকে পরামর্শ দেন। মাননীয় স্পিকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ বিধি অনুসারে উপরোক্ত জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিশ প্রদান করেছি। এমতাবস্থায় জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫-এর বাস্তবায়ন প্রস্তাবনায় বর্ণিত পরিস্থিতি ও কারণ উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে বলে আমি মনে করি।
তিনি বলেন, যেহেতু সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটিয়েছে এবং যেহেতু উক্ত গণঅভ্যুত্থানের ফলে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে, ৬ আগস্ট ২০২৪ তারিখে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ৮ই আগস্ট তারিখে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারÑঅর্থাৎ যে সরকার কয়েকদিন আগেই মাত্র বিদায় নিলÑতাহা গঠিত হয়, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকারিতা এবং স্বীকৃতি লাভ করিতে সক্ষম হয়েছে। যেহেতু রাষ্ট্রীয় সংস্কার সাধনের মাধ্যমে সুশাসন, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করিবার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং উক্ত কমিশনসমূহ স্ব-স্ব প্রতিবেদন সরকারের নিকট পেশ করেন।
তিনি আরো বলেন, যেহেতু উপরোক্ত প্রতিবেদনগুলোতে অন্তর্ভুক্ত সুপারিশসমূহের বিষয়ে জাতীয় ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন গঠন করেন এবং যেহেতু জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল ও জোটের সহিত আলোচনাক্রমে 'সংবিধান সংস্কারসহ অন্যান্য সংস্কারের সুপারিশ সম্বলিত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫' প্রণয়ন করে এবং রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ সম্মিলিতভাবে উক্ত সনদে স্বাক্ষর ও তাহা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন। যেহেতু সংবিধান সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়নের জন্য সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী জনগণের অনুমোদন প্রয়োজন এবং তদুদ্দেশ্যে গণভোট অনুষ্ঠান, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও উক্ত পরিষদ কর্তৃক সংবিধান সংস্কার করার প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে এবং যেহেতু উপরে বর্ণিত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করিবার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করা একান্ত প্রয়োজন। এ জন্যই রাষ্ট্রপতি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন।
পয়েন্ট অব অর্ডারের শুরুতেই উত্থাপন
গতকাল রোববার বিকেলে সংসদের বৈঠকে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়ার পরপরই পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নোটিশটি সংসদে উত্থাপন করেন এবং এটি নিয়ে আলোচনা করার দাবি জানান। কিন্তু সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী আগে প্রশ্নোত্তর ও জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের ওপর আলোচনা শেষ করতে হবে। এরপর অন্য কোনো নোটিশ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
পরে সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল জানান, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের ওপর আলোচনা শেষে বিরোধী দলের আনা নোটিশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, এই পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার শেষ দিন ছিল গত ১৫ মার্চ। সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধী দলকে বিধি অনুযায়ী নোটিশ দেওয়ার পরামর্শ দেন।
ঈদের ছুটির পর গতকাল সংসদের অধিবেশন আবার শুরু হয়। সংবিধান সংস্কার পরিষদের গঠন নিয়ে আলোচনার জন্য নোটিশ দেয় বিরোধী দল।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নোটিশটি সংসদে উত্থাপন করে বলেন, ১৫ মার্চ তিনি পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে একটি অতি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেছিলেন। স্পিকার পরামর্শ দিয়েছিলেন নোটিশ আনার জন্য। তাঁরা সেটা করেছেন। তিনি এই নোটিশ সংসদে উত্থাপন করলেন। তিনি নোটিশটি গ্রহণ করে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের বিষয়ে আলোচনার দাবি জানান।
চিফ হুইপ
এর পরপরই ফ্লোর নিয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর ও বিধি-৭১–এর নোটিশের আলোচনা শেষে অন্য বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
জবাবে বিরোধদলীয় নেতা বলেন, প্রশ্নোত্তরের পরেই এ আলোচনা হবে। তিনি সে মোতাবেকই দাঁড়িয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
এরপর ফ্লোর নিয়ে কথা বলতে চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তখন বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানান। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কথা বলার সুযোগ দেন স্পিকার। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। সরকারি দল বিধি মোতাবেক আলোচনার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে। রীতি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধির পর মুলতবি প্রস্তাব আলোচনা হতে পারে। তখন সরকারি দলও পয়েন্ট অব অর্ডারে কিছু কথা বলবে। তিনি স্পিকারকে বিধি মোতাবেক এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
নাহিদ ইসলাম
এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে কীভাবে এই সংসদ গঠিত হয়েছে, তা সবাই ভুলে যাচ্ছে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও হয়েছিল। কিন্তু এখন কার্যক্রম দেখলে মনে হয় এ ধরনের কিছুই হয়নি। এটি সবচেয়ে বেশি জনগুরুত্বপূর্ণ, এ সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত, এর সুরাহা হওয়া উচিত। তারপর নিয়মিত সব কার্যক্রম হওয়া উচিত। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা বিধি মোতাবেকই নোটিশ দিয়েছেন। সেটা নিয়ে আগে আলোচনা করার অনুরোধ করেন তিনি।
তবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, স্পিকার চাইলে অনুমতি দিতে পারেন। কিন্তু প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এগুলো সংসদ সদস্যদের অধিকার। এ দুটি কার্যসূচির জন্য ২ ঘণ্টা বরাদ্দ। এরপর অন্য সব বিষয়ে আলোচনা আসতে পারে। তাঁদের দিক থেকে অসুবিধা নেই।
পরে সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, তিনি বিরোধী দলের নোটিশটি পেয়েছেন। তিনি এটা অ্যাড্রেস করবেন। সংসদের রীতি মেনে বিধি-৭১-এর নোটিশগুলো নিয়ে আলোচনা শেষে তিনি বিরোধী দলের আনা নোটিশটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।