২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে পুলিশের সর্বকনিষ্ঠ পদ ‘কনস্টেবল’ নিয়োগে যে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে, তা বাদ দিয়েই পরবর্তী ১১ বছরের নিয়োগ নিয়ে সকল অনিয়মের তদন্তে নেমেছে পুলিশ। এছাড়া, আলোচ্য তিন বছরের বাইরে রয়ে গেছে আরও দুই বছর। সবমিলে ৫ বছরের নিয়োগে অনিয়মের সকল ঘটনা বাদ দিয়ে তদন্ত করার নির্দেশ পেয়ে মাঠ পুলিশের মধ্যেই নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
২০০৯ সালের শুরুতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। টানা ১৫ বছর নানা উপায়ে ক্ষমতায় থেকে ২০২৪-এর ছাত্রজনতার আন্দোলনে দেশ ছেড়ে পালায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। এই ১৫ বছরে পুলিশের বিভিন্ন স্তরে লাখের অধিক নিয়োগের ঘটনা ঘটে। আলোচিত ঘটনা ঘটে কনস্টেবল পদে, যার সংখ্যা ৮০ হাজারের অধিক। শুধুমাত্র ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা সাজিয়ে এক হাজার লোককে পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির গত ১৫ মার্চ এক অফিস আদেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারকে এই দুর্নীতির তদন্ত করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির সময়কাল ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫ বছর সময়কাল কেন তদন্তের আওতায় আনা হয়নি তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কার বা কাদের স্বার্থে এই ৫ বছর তদন্তের আওতায় আসেনি তা নিয়ে খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন।
আইজিপির নির্দেশনায় জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য সকল বিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি তদন্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ এপ্রিলের মধ্যে এই তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের এই কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। কমিটিতে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), জেলা গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং রিজার্ভ অফিস ইন্সপেক্টরকেও অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়েছে।
প্রতিটি কমিটিকে ৬টি বিষয়ে তদন্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরিপ্রাপ্তি সংক্রান্ত; অর্থাৎ ভিন্ন জেলার প্রার্থীকে শুধুমাত্র জমি ক্রয়ের ওপর ভিত্তি করে স্থায়ী নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে নিয়োগ করা হয়েছে কি না? অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে কৌশলে পৃথক কক্ষে বিশেষ পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণ সংক্রান্ত, প্রার্থী বা তার পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগযোগ্য বা নিয়োগ অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে কি না, লিখিত পরীক্ষার নম্বর ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের মধ্যে অস্বাভাবিকতা অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেয়ে চাকরি পেয়েছে কি না, প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত বিষয় এবং অসাধু পুলিশ সদস্য, দালালচক্র, প্রতারকচক্র তথা পরীক্ষার পরিবেশ বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কতটা তৎপর ছিলেন। নিয়োগকারীরা তা খতিয়ে দেখার জন্য বলা হয়েছে। পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের দুর্নীতির তদন্তে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫ বছর সময়কাল কেন তদন্তের আওতায় আনা হয়নি এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন গত সোমবার দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, কনস্টেবল নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বর্তমানে কর্তৃপক্ষ ২০১৪-২৪ সময়কালকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যক্রম নিয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ বা অভিযোগ পাওয়া গেলে ওই সময়কালকেও বিধি অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হবে।
জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৫ বছর পর্যন্ত পুলিশে প্রায় এক লাখ ট্রেইনি কনস্টেল নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। কনস্টেবল নিয়োগের অধিকর্তা হলেন প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপার। এই সময়ে লিখিত পরীক্ষায় পাস না করলেও শুধুমাত্র মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর এমনকী রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় থেকে তালিকা পাঠানো হতো জেলা পুলিশ সুপারদের কাছে। সেই তালিকা অনুযায়ী জেলা পুুলিশ সুপারগণ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সেই তালিকা অনুমোদনের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠাতেন। সদর দপ্তর চূড়ান্ত মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন করে নিয়োগপত্রের চিঠি ইস্যু করে প্রশিক্ষণে পাঠাতো। অধিকাংশ নিয়োগের ক্ষেত্রেই ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ আসে তখন।
জানা গেছে, কনস্টেবল নিয়োগের জন্য যে জেলা কোটা ছিল তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোটা থাকতো ঢাকা জেলায়। কিন্তু ঢাকা জেলায় নিয়োগ প্রত্যাশী স্থায়ী বাসিন্দা খুবই কম পাওয়া যেতো। যেকারণে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই জেলায় নিয়োগ প্রাপ্তদের বেশিরভাগই সাভার, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ, আশুলিয়া, দোহার ও নবাবগঞ্জ জেলার জাল জমির কাগজপত্র দাখিল করে। আবার অনেকেই জমি কিনেও সেই কাগজপত্র দাখিল করে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ আসার পর ২০১৮ সালে হঠাৎ কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করেন তৎকালীন আইজিপি। পরবর্তীকালে তিনি স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রতিটি জেলায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ তদারকি টিম পাঠান। এই টিমের সদস্যরা পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া দেখভাল করেন। তখন থেকেই শুরু হয় লিখিত পরীক্ষায় কেউ পাস না করলে তাকে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়। যত বড় প্রভাবশালীরই তদবির হোক নিয়োগের প্রথম শর্তই হলো লিখিত পরীক্ষায় পাস করতে হবে। এরপর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষায় পাস না করলে কোন তদবির শোনা হতো না।
পুলিশ সূত্র বলেছে, আগে মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় থেকে পাঠানো তালিকার ভিত্তিতেই নিয়োগ করা হতো। ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর ও আসাদুজ্জামান খান কামাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার দপ্তর থেকে প্রতিটি জেলায় তালিকা পাঠানো হতো। সেই তালিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা হতো নিয়োগ প্রক্রিয়া।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮ সালের আগ পর্যন্ত পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে সব জেলাতেই ক্ষমতাসীন দলের নেতারা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। এসব পদে নিয়োগের জন্য দলীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা ডিও লেটার(আধা সরকারি পত্র) পাঠান পুলিশ সুপারদের (এসপি) কাছে। তাদের তদবির না রাখলে অনেক সময় বেকায়দায়ও পড়তে হয় এসপিদের। অনেক জেলা পুলিশ সুপারও (এসপি) অর্থনৈতিক লেনেদের মাধ্যমে নিয়োগ দেন এমন অভিযোগও আসে।
পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে মাদারীপুর জেলার সাবেক এসপি ও ডিআইজি সুব্রত কুমার হালদারকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০১৯ সালে মাদারীপুর পুলিশ সুপারের দায়িত্বে থাকাকালে কনস্টেবল পদে নিয়োগে দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। নিয়োগ প্রার্থীদের পরীক্ষার বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে এবং ১৭ প্রার্থীর কাছ থেকে এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা ঘুষ নেন তিনি। পুলিশ সদর দপ্তর এ বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে দুদককে চিঠি লেখে। পরে দুদক তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। সেই মামলায় কারাগারে যান সুব্রত কুমার হালদার।