নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা নিয়ে করা এক বিতর্কিত চুক্তির আড়ালে উঠে এসেছে ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতি ও রাজনৈতিক স্বার্থসংঘাতের চিত্র। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে আগামী ২২ বছরে শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ মহলে কমিশন হিসেবে যাবে প্রায় ৮১ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, বিপরীতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়াবে প্রায় ৩৯ কোটি মার্কিন ডলার। অভিযোগ রয়েছেÑ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে চুক্তিটি সম্পন্ন হয় এবং বিরোধিতা করায় সরিয়ে দেওয়া হয় বন্দরের এক চেয়ারম্যানকে।
শেখ হাসিনার নির্দেশেই চুক্তি : বন্দর সূত্র
বন্দর সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশেই পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশী অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় সে সময়ের চট্টগ্রাম বন্দরের এক চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ৩১ জুলাই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে পিপিপি ভিত্তিতে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে। তবে ২০২২ সালের ৭ জুন চূড়ান্ত চুক্তি হয় যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত রেড সি গেটওয়ে ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।
সালমান এফ রহমান ও শেখ পরিবারের সংশ্লিষ্টতা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই আরএসজিটিআই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের শেয়ার ছিল। পাশাপাশি শেখ মুজিবুর রহমানের চাচাতো ভাই শেখ হাফিজের মালিকানাধীন এসএইচআর শিপিং এই বিদেশী প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, এখানেই চুক্তির সবচেয়ে বড় স্বার্থ-সংঘাত ও অনিয়মের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের অঙ্কে বিপুল কমিশন
চুক্তি অনুযায়ী, বিদেশী অপারেটর প্রতিষ্ঠানটি ২২ বছরে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে মোট ১ কোটি ২ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করবে। প্রথম ৪ বছরে ৩ লাখ করে মোট ১২ লাখ টিইইউএস ; পরবর্তী ১৮ বছরে ৯০ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করবে বিদেশী অপারেটর প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাবদ আদায় করা হচ্ছে ১০০ থেকে ১০২ ডলার। অথচ চুক্তি অনুযায়ী বন্দর কর্তৃপক্ষ পাচ্ছে মাত্র ২০ ডলার। অর্থাৎ প্রতিটি কনটেইনারে বিদেশী প্রতিষ্ঠান নিয়ে যাচ্ছে ৮০ ডলার। এই হিসাবে ২২ বছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় দাঁড়াচ্ছে ৮১ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা অভিযোগ অনুযায়ী শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ মহলে কমিশন হিসেবে যাচ্ছে।
বন্দর নিজে পরিচালনা করলে লাভ হতো দ্বিগুণেরও বেশি
বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত সিসিটি ও এনসিটি টার্মিনালে প্রতি টিইইউএস কনটেইনারে খরচ বাদ দিয়ে নিট লাভ হয় ৫৬ থেকে ৫৮ ডলার। সে হিসেবে পিসিটি যদি বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেই পরিচালনা করত, তাহলে ১ কোটি ২ লাখ কনটেইনারে সম্ভাব্য লাভ হতো ৫৭ কোটি ১২ লাখ থেকে ৫৯ কোটি ১৬ লাখ ডলার। কিন্তু বর্তমান চুক্তিতে বন্দর পাবে মাত্র ২০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষের সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ৩৬ কোটি ৭২ লাখ থেকে ৩৮ কোটি ৭৬ লাখ ডলার।
পিপিপি নিয়ম লঙ্ঘন
আরও গুরুতর হলো-পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ছিল সম্পূর্ণ নির্মিত একটি ‘গ্রে-ফিল্ড প্রকল্প’। অথচ পিপিপি নীতিমালা অনুযায়ী বিদেশী বিনিয়োগ সাধারণত ‘গ্রিন-ফিল্ড প্রকল্পে’ দেওয়ার কথা। সেই নিয়ম উপেক্ষা করেই পতিত সরকারের সিদ্ধান্তে টার্মিনালটি আরএসজিটিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
চেয়ারম্যান সরানো ও রিয়ার এডমিরাল সোহায়েলের নিয়োগ
এই চুক্তির বিরোধিতা করায় তৎকালীন চট্টগ্রাম বন্দরের এক চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, চুক্তিতে প্রতারণার বিষয়টি তিনি ধরে ফেলেছিলেন এবং তা নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীকে একাধিকবার জানান। প্রতিক্রিয়া না পেয়ে তিনি বিষয়টি লিখিতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানান। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই চিঠি পাঠানোর কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
তার স্থলাভিষিক্ত হন শেখ হাসিনার আস্থাভাজন, র্যাবের সাবেক মুখপাত্র রিয়ার এডমিরাল এম সোহায়েল। তার মাধ্যমেই চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা হয়। বর্তমানে এম সোহায়েল গণহত্যার সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
পরিকল্পিতভাবে টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ
বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, নোয়াখালীর সাবেক এমপি ইকরামুল ইসলাম ও পটিয়ার সাবেক এমপি বিচ্ছু শামসুর প্রভাবে ঢাকার আওয়ামী লীগ নেতাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো বন্দর অবকাঠামোয় সরাসরি প্রবেশ করতে পারেনি। এরপর থেকেই আলাদা টার্মিনাল নির্মাণ করে বিদেশি অপারেটরের আড়ালে নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেন সালমান এফ রহমান। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই প্রথমে পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনাল, পরে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়।
চুক্তি পুনর্বিবেচনার দাবি
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রামের শিপ হ্যান্ডলিং ও বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের এক শীর্ষ নেতা বলেন,“চট্টগ্রাম বন্দরের যেসব টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হয়েছে, তার প্রতিটির সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে শেখ হাসিনার পরিবারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।”তিনি অবিলম্বে এই চুক্তি রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) এবং আর্থিক অনিয়ম তদন্তের দাবি জানান।
পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল চুক্তি শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়-এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার, স্বার্থসংঘাত এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগের একটি বড় উদাহরণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও চুক্তি পুনর্বিবেচনা না হলে চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে-এমন আশঙ্কাই এখন জোরালো।