প্রচার-প্রচারণা সময় শেষ হওয়ার পর এবার নির্বাচনী লড়াইয়ের নতুন ময়দান হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। মাঠের মিছিল, সভা-সমাবেশ থেমে গেলেও ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্সে চলছে জোর প্রচার, পাল্টাপাল্টি দাবি ও রাজনৈতিক বার্তার বন্যা।
নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময় শেষে সরাসরি প্রচারণা বন্ধ হলেও প্রার্থী ও সমর্থকদের অনলাইন তৎপরতা থেমে নেই। বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা পোস্ট, ভিডিও, লাইভ সম্প্রচার এবং গ্রাফিক্সের মাধ্যমে নিজেদের পক্ষে জনমত গড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ, পুরোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড তুলে ধরে সমালোচনাও বাড়ছে।
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে ছোট ভিডিও, আবেগঘন বার্তা ও ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে বেশি। অনেক ক্ষেত্রে এসব কনটেন্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ছে, যা ভোটারদের মনোভাব প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে গত ৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনার ( ইসি) রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা যথাযথভাবে প্রতিপালন নিশ্চিত করার লক্ষে একটা চিঠি দিয়েছিল।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধি ১৬-তে উল্লেখ রয়েছে— ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা পরিচালনা করতে পারবে। তবে সেক্ষেত্রে— (ক) প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা দল বা প্রার্থী সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য শনাক্তকরণ তথ্যাদি উক্তরূপে প্রচার-প্রচারণা শুরুর পূর্বে রিটার্নিং অফিসারের নিকট দাখিল করবেন।’
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ এ নির্বাচনী ব্যয়সীমা সম্পর্কে বিধি ২২-এর (২) এ আরো উল্লেখ রয়েছে যে, ‘কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা তৎকর্তৃক মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাহাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচন বিষয়ক কোনো কনটেন্ট তৈরি, বিজ্ঞাপন প্রদান, বুস্টিং ও স্পন্সরশিপসহ সকল প্রচার-প্রচারণার ব্যয়ের শিরোনামে সামগ্রিক নির্বাচনী ব্যয়সহ নির্বাচন কমিশন বরাবর দাখিল করিবেন।’
এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার প্রচারণায় যে ব্যয় হবে তা নির্বাচনী ব্যয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে রিটার্নিং অফিসারকে দাখিল করার বিধান রয়েছে।
এমতাবস্থায়, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালায় উল্লিখিত বিষয়সমূহ যথাযথভাবে প্রতিপালন নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশিত হয়ে অনুরোধ করা হলো। একইসাথে রিটার্নিং অফিসারগণকে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীগণ কোন কোন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে, সে সংক্রান্ত তথ্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে জনসংযোগ শাখায় প্রেরণ করার জন্য নির্দেশিত হয়ে অনুরোধ করা হলো।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারণা শেষ হলেও ভোটের আগের শেষ মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়া অনেক ক্ষেত্রে মাঠের প্রচারণার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা বন্ধ থাকলেও অনলাইন অঙ্গনে রাজনৈতিক লড়াই চলছে।
বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তার এক অর্থে গণতান্ত্রিক পরিসরকে বড় করেছে। এখন যে কেউ নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, প্রশ্ন তুলতে পারে, এমনকি রাষ্ট্রক্ষমতার সমালোচনাও করতে পারে। নির্বাচনের প্রাক্কালে এই সুযোগ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ ভোটাররা বিভিন্ন মত ও তথ্য জানার সুযোগ পান।
কিন্তু এই স্বাধীনতার সঙ্গে যে দায়িত্ববোধ থাকার কথা, সেটিই আজ সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত। অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়াকে এমন একটি জায়গা মনে করছেন, যেখানে কোনো সীমা নেই, কোনো শিষ্টাচার নেই, কোনো নৈতিক দায়ও নেই। এর ফল হিসেবে নির্বাচনী আলোচনার ভাষা ক্রমেই কঠোর ও অসংযত হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে তরুণ প্রজন্মের ওপর। তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়ার প্রধান ব্যবহারকারী এবং নির্বাচনের আগে তারাই বিভিন্ন রাজনৈতিক কনটেন্ট সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করছে। তাদের একটি অংশ প্রচলিত রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রতি হতাশ।
তারা মনে করে, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার পালাবদল হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। এই হতাশা থেকে তারা এমন কণ্ঠস্বর খুঁজে নেয়, যারা প্রচলিত ধারার বাইরে কথা বলে, যারা কাউকে তোয়াক্কা করে না বলে মনে হয়। নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে কিছু বক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতা এই মনোভাবকে কাজে লাগাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের আগের শেষ কয়েক ঘণ্টায় সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব অনেক সময় মাঠের প্রচারণার চেয়েও বেশি হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অনিশ্চিত ও দোদুল্যমান ভোটারদের ক্ষেত্রে অনলাইন বার্তা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শেষ হলেও ডিজিটাল পরিসরে যে রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে, তা স্পষ্ট।