জনগণের পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, বিগত সরকারের মতো জোরজবরদস্তি করে নয়, বরং দেশের প্রচলিত আইন মেনেই অর্থ পাচারকারী ও তছরুপকারীদের বিচার করা হবে।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম।

পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, এটি জনগণের অর্থ। যেহেতু আমরা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সরকার, জনগণের প্রতি এবং দেশের প্রতি আমাদের একটি দায়বদ্ধতা আছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই জনগণের অর্থ ফিরিয়ে এনে জনগণের জন্য এবং দেশের কল্যাণে ব্যয় করা এই সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, যে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জনগণের অর্থ ফেরত আসবে, আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন এই সরকার সেই পদক্ষেপই গ্রহণ করবে, ইনশাআল্লাহ।

পরবর্তীতে রাজশাহীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের অপর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী অর্থ পাচারকারীদের তালিকা প্রণয়ন ও বিচারের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেন।

পাচারকারীদের তালিকা তৈরি প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই অন্যায়ের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের তালিকা করার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ রয়েছে, তারাই এই তালিকা তৈরি করছে।

বিগত সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার একটি নির্বাচিত সরকার। আমরা অতীতে দেখেছি, সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ তাদের ইচ্ছা-আগ্রহের কারণে দেশের আইনকানুন ও নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে যাকে যখন ইচ্ছা তুলে নিয়ে গেছে। যার কাছ থেকে যা মনে হয়েছে, জোর করে লিখিয়ে নিয়েছে।

বর্তমান সরকারের আইনি কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা দেশের প্রচলিত আইন মেনে কাজ করতে চাই এবং আইনের ভিত্তিতেই বিচার করতে চাই, যাতে কোনো মানুষ ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়।

আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনগতভাবেই আমরা সব প্রক্রিয়া গ্রহণ করব।

আইন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ীই এ দেশের জনগণের অর্থ তছরুপকারী বা অর্থ পাচারকারীদের শাস্তি নির্ধারিত হবে।

দেশে-বিদেশে ৭০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে

দেশে-বিদেশে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ (ফ্রিজিং) করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।

জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য জানান। সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম।

সম্পদ জব্দের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক দেশে মোট ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

অপরদিকে, আদালতের নির্দেশে বিদেশে মোট ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে সর্বমোট প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার সম্পদ সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

মামলার হালনাগাদ তথ্য জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা রুজু করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে।

বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বছরে গড় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা)। বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক দেশে মোট ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। অপরদিকে, আদালতের নির্দেশে বিদেশে মোট ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে সর্বমোট প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার সম্পদ সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। পাচার হওয়া এ অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে।

তারেক রহমান জানান, অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশকে (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকং-চীন) চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি দেশের (মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত) সঙ্গে 'পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি' (এমএলএটি) স্বাক্ষরের বিষয়ে সম্মতি মিলেছে। অপর ৭টি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্স কর্তৃক চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মামলাগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে এবং পুলিশের সিআইডি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল ও শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

কৃষক কার্ড-ফ্যামিলি কার্ডে টাকা দিলেও মূল্যস্ফীতি হবে না

কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের কারণে দেশে কোনো ধরনের মূল্যস্ফীতি হবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বরং অর্থনীতি আরও সচল হবে বলে তিনি জানান।

সংসদ সদস্য আক্তার হোসেনের এক সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্য আপনি যে প্রশ্নটি করেছেন-কতজন মানুষের কাছে আমরা কার্ড পৌঁছে দেব, মূল্যস্ফীতি হবে কি না, বাজেট কত-স্বাভাবিকভাবে বাজেট কত, এটি আমরা এখনই বলছি না। অর্থাৎ আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে বিষয়গুলো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাব। আমরা যেহেতু প্রতি মাসে এটি সম্প্রসারণ করতে থাকব, অর্থাৎ অধিক সংখ্যক নারী ফ্যামিলি কার্ড পাবেন এবং অধিক সংখ্যক পুরুষ কৃষক কার্ড পাবেন-একবারে সবাইকে দেওয়া সম্ভব নয়। পৃথিবীর কোনো দেশের পক্ষেই একবারে এটি করা সম্ভব নয়। সেজন্য প্রতিবছর আমরা বাজেটের পরিমাণ বাড়াব এবং প্রতি বাজেটে বরাদ্দ রাখা হবে।

তিনি বলেন, এভাবে পর্যায়ক্রমিকভাবে ধীরে ধীরে আমরা এগোব এবং অবশ্যই এটি বাজেটে প্রাধান্য পাবে। আর আপনি যেটা বলেছেন মূল্যস্ফীতি হবে কিনা-আমরা তো টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছি না। কাজেই মূল্যস্ফীতি হওয়ার প্রশ্নই আসে না। ‘বরং আমরা মনে করি, এই টাকাগুলো যখন বাজারে যাবে, তখন প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক ও নারীরা তা দেশের ভেতরেই ব্যয় করবেন। তারা এই টাকা বিদেশে পাচার করবেন না; বরং স্থানীয় অর্থনীতিতে খরচ করবেন।’

সংসদ নেতা বলেন, একজন নারী এই টাকা দিয়ে সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের খাদ্যব্যবস্থা বা ছোট কোনো ব্যবসা শুরু করতে পারেন। ফলে সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে এবং অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো নারী যদি এই টাকা দিয়ে স্থানীয় মুদির দোকান থেকে পণ্য কেনেন, তাহলে ওই দোকানের বিক্রি বাড়বে। এতে দোকানির আয় বাড়বে এবং প্রয়োজনে তিনি নতুন কর্মচারী নিয়োগ দিতে পারবেন। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় অর্থনীতি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হবে। দেশের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ স্থানীয় শিল্পের পণ্য ব্যবহার করে। ফলে এসব উদ্যোগ স্থানীয় শিল্পকে আরও শক্তিশালী করবে।

পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মনে করি না যে এতে মূল্যস্ফীতি হবে। বরং অর্থনীতি আরও সচল ও শক্তিশালী হবে। হয়তো আগামী ছয় মাসে বড় পরিবর্তন দেখা যাবে না, তবে তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।

২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়া হবে

আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইতোমধ্যে প্রায় ২২০০০ কৃষককে এই পাইলট প্রজেক্টের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যে কৃষক কার্ডটি দেব, ইনশাল্লাহ আগামী ১৪ তারিখে পয়লা বৈশাখের দিন চালু করতে যাচ্ছি।

এই পাইলট কর্মসূচির আওতায় এরই ভেতরে মোটামুটিভাবে ২২০০০ বিভিন্ন ধরনের কৃষক রয়েছেন। প্রায় ২২০০০ কৃষককে এই পাইলট প্রজেক্টের আওতায় নিয়ে এসেছি। বাংলাদেশের ১০টি জেলায় এই কর্মসূচি আমরা শুরু করতে যাচ্ছি। আপনি জিজ্ঞেস করেছেন যে, কবে নাগাদ সমগ্র বাংলাদেশে এটি সকল কৃষককে আমরা দিতে পারব।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কাছে যে হিসাব আছে, তাতে প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখের কাছাকাছি কৃষক আছে, প্লাস মাইনাস। ইনশাল্লাহ পর্যায়ক্রমিকভাবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চেষ্টা করব, আমাদের সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে সকল কৃষকের কাছে পর্যায়ক্রমিকভাবে পৌঁছানোর।