বেসরকারী ও অলাভজনক সংস্থা কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন এন্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ (বিইপিওএস) যৌথ উদ্যোগে দেশব্যাপী ১১ হাজারের অধিক মানুষের ওপর একটি জরিপের ভিত্তিতে আসন্ন নির্বাচনে মানুষের ভোটদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আচরণগত দিক ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। সেই সঙ্গে সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে কিছু সুস্পষ্ট পরামর্শ উঠে আসে।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘আনকাভারিং দ্য পাবলিক পালস: আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন এটা প্রকাশ করা হয়।

জরিপে প্রকাশ করা হয়, বাংলাদেশের ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটারদের অংশগ্রহণ, অগ্রাধিকার, নেতৃত্ব সংক্রান্ত ধারণা, নির্বাচনী পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে জনমতের বিষয় অনুসন্ধান করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। পর্যায়ক্রমিক দৈব নমুনায়ন (স্ট্রাটিফাইড র‌্যান্ডম স্যাম্পলিং) করে ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দুই ধাপে মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত ১১,০৩৮ জন ভোটারের উপর পরিচালিত হয়েছে এ জরিপ।

ফলাফল থেকে দেখা যায়, ভোটারদের মধ্যে শাসনব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা বিষয়ে প্রবল মনোযোগ রয়েছে। অধিকাংশ ভোটারই ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, পরিচয়ভিত্তিক বা ধর্মীয় ইস্যুর তুলনায় দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ভোটাররা। সেই সঙ্গে এমন নেতৃত্বের প্রতি দৃঢ় পছন্দ দেখিয়েছেন যারা মানুষের কথা ভাবেন এবং কার্যকর নেতৃত্ব প্রদর্শন করেন।

একই সঙ্গে, রাজনৈতিক তথ্যের জন্য অধিকাংশ ভোটার প্রচলিত ও ডিজিটাল—উভয় মাধ্যমের তথ্য সমন্বয় করছেন। তারা নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে কিছু সাধারণ উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন, যার মধ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জালিয়াতির আশঙ্কা উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি, ২০০৮ সালের পর প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ভোটার এবং আগের কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন এমন ভোটারদের আগামী নির্বাচনে দলীয় পছন্দের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বৈচিত্র্য দেখা যায়। প্রতিবেদনটি মোট সাতটি অংশে বিভক্ত।

বিপুল ভোটার অংশগ্রহণের প্রত্যাশা: ৯০%-এর বেশি ভোটার জানিয়েছেন যে তারা ভোট দিতে চান। মাত্র প্রায় ৮% ভোটার এখনো অনিশ্চিত বা ভোটে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন না। লিঙ্গ, বয়স, শিক্ষা বা বসবাসের স্থানভেদে এই প্রবণতায় খুব বেশি পার্থক্য দেখা যায় না।

আত্মপরিচয়ের চেয়ে শাসন ব্যবস্থায় সচ্ছতা বেশি প্রাধান্য পাবে: আসন্ন নির্বাচনে দুর্নীতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে—৬৭.৩% ভোটার এটি উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে ধর্মের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন মাত্র ৩৫.৯% ভোটার, যা বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও এটিকে তুলনামূলক কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ইস্যুতে পরিণত করেছে।

জনদরদী নেতা চায় ভোটাররা: নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এবং সব বয়সী ভোটারদের মধ্যেই এমন নেতাদের প্রতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যারা মানুষের কথা ভাবেন এবং শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রদর্শন করেন। ব্যক্তিগত ক্যারিশমার তুলনায় এই গুণগুলো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

রাজনৈতিক তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবচেয়ে প্রভাবশালী। ভোটাররা সাধারণত একাধিক উৎসের ওপর নির্ভর করেন এবং একটি মাত্র মাধ্যমের পরিবর্তে এসব প্ল্যাটফর্মের সমন্বিত ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

ভোটাররা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার চেয়ে ভোটকেন্দ্রের সরেজমিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। ভয়ভীতি প্রদর্শন, জালিয়াতি এবং ব্যালট দখল—এসব উদ্বেগ সব দলের ভোটারদের মধ্যেই প্রধান হিসেবে উঠে এসেছে, যদিও দলভেদে উদ্বেগের মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে।

আওয়ামী লীগ ভোটার এবং ২০০৮ সালের পর প্রথমবার ভোট দেওয়া ভোটারদের দলীয় পছন্দে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। সাবেক আওয়ামী লীগ ভোটারদের প্রায় অর্ধেক (৪৮%) এখন বিএনপিকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে, ২০০৮ সালের পর প্রথমবার ভোট দেওয়া ভোটারদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি (৩৭.৪%) জামায়াতকে পছন্দ করছেন।

বেশিরভাগ ভোটারই তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে প্রার্থীকে গুরুত্ব দেন—এককভাবে বা দলের সঙ্গে মিলিয়ে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার ভোট দেওয়ার সময় প্রার্থীকে বিবেচনায় নেন। এর মধ্যে ৩০.২% শুধুমাত্র প্রার্থীকে ভিত্তি করে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন এবং ৩৩.২% ভোটার প্রার্থী ও দল—উভয় বিষয়ই বিবেচনা করেন।

এটি উপস্থাপন করেন লেখক, গবেষক এবং সিআরএফ-এর স্ট্র্যাটেজিক কো-অরডিনেটর জাকারিয়া পলাশ।

সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, যুক্তরাজ্যের University of Reading -এর অর্থনীতি বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর ড. এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক।