অর্থনৈতিক রিপোর্টার : বিগত সরকারের আমলে উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়া হয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নেও অনেক ফাঁকফোকর ছিল বলে জানিয়েছেন এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর চীনমৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও নাগরিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সিটিজেনস প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়নের প্রধান লক্ষ্য হলো কাউকে পেছনে ফেলে উন্নয়ন নয়। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে মূল ধারায় নিয়ে আসা। এজন্য এসব জনগোষ্ঠীকে বাড়তি সুবিধা দিতে হবে বলে মনে করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম। এসডিজি বাস্তবায়নের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনতে বাড়তি সুবিধা দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্লাটফর্মটি।
সেমিনারে পৃথক দুই সেশনে নারী-শিশু নির্যাতন ও শিশুশ্রমের বিষয় উঠে আসে। তাদের আইনি সুরক্ষা বাড়াতে জোর দেয়া হয়। এসময় নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় বিগত সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের সমালোচনা করেন। বলেন, সমাজে আগে দেখা না গেলেও এখন কেউ কেউ নৈতিক খবরদারি করার দায়িত্ব নিয়েছেন। তারা সংখ্যায় বেশি না হলেও তাদের কণ্ঠস্বর উচ্চ। এ কণ্ঠস্বরের মোকাবিলায় উদারনৈতিক সমাজের পক্ষের মানুষদের সোচ্চার হতে হবে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার বিভাজিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের মাধ্যমে উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। চেপে ধরা হয়েছে বেসরকারি সংগঠনগুলোর টুঁটি। কথা বলতে দেয়া হয়নি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোকেও এসডিজি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে যথাযথ উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান উঠে আসে সেমিনারে।
দেবপ্রিয় বলেন, ‘এ সময়কালে আমরা সবচেয়ে বড় আন্দোলন করলাম দেশ বৈষম্যবিরোধী হবে, কিন্তু আমরা কি সব বৈষম্যের কথা বলি? আমরা তো সব বৈষম্যের কথা বলি না। আমরা কোনো বৈষম্যের কথা বলি, কোনো বৈষম্যকে এড়িয়ে যাই।’
এ প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, ‘নারী ও পুরুষের বৈষম্যের কথা বলতে গিয়ে আমি তো লিঙ্গবৈচিত্র্যের কথা তো বলি না। আমি যখন জাতীয়তার প্রশ্নে কথা বলি, তখন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা তাদের জাতিসত্তার স্বীকৃতির কথা তো বলি না। যে সময়কালে আমরা নতুন আত্মস্বীকৃত জাতীয়সত্তাকে অনুসন্ধানে নেমেছি, তখন আমি বহুত্ব বা বহুধরনের মানুষ নিয়ে যে আমাদের বাংলাদেশ, সেটার কথা তো সেভাবে মনে করি না।’
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘নারীর সব সুরক্ষার কথা কি আমরা বলি? তার আইনি সুরক্ষা বা আইনি উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে কি আমরা সমানভাবে উচ্চারণ করতে পারি? কারণ হলো যে জিনিসটা আগে সে রকমভাবে ছিল না, এখন এসেছে। একধরনের নৈতিক খবরদারি করার দায়িত্ব কেউ কেউ নিয়েছেন।’
ঘরে নিরাপদে বসে থেকে অন্য কেউ পরিবর্তন নিয়ে আসবে, এমন ভাবনাকে বোকামির নামান্তর বলে মন্তব্য করেন তিনি। দেবপ্রিয় বলেন, ‘আমি নিরাপদে থাকব ঘরে আর আমার পক্ষে মানুষ পরিবর্তন করে দেবে, আবার ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থান করবে, এটা মনে করা বোকামি হবে। প্রত্যেক নাগরিককে তার অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।’
বাংলাদেশে প্রয়োজনভিত্তিক উন্নয়ন থেকে অধিকারভিত্তিক উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে বলে অভিমত দেন ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ মানবাধিকারবিষয়ক উপদেষ্টা হুমা খান। তিনি বলেন, ‘আমরা পিছিয়ে আছি এভাবে না ভেবে, আমাদের কোন কোন অধিকার আদায় না হওয়ায় পিছিয়ে থাকার মতো অবস্থা তৈরি হচ্ছে, সেটা চিহ্নিত করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোর্শেদ বলেন, আলোচনা থেকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যেসব চ্যালেঞ্জ ও ঘাটতির কথা উঠে এসেছে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার পরিকল্পনা সাজাবে।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেটো রেঙলি এবং ইউএনডিপির বাংলাদেশ কার্যালয়ের আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন লিলার বক্তব্য দেন।