জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার ভেতরে থাকা স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সরকারি বাসভবন একীভূত করে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর জন্য ব্যবহারের যে প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সে পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার জানিয়েছে, নতুন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন কোথায় হবে—সে সিদ্ধান্ত এখন নির্বাচিত সরকারের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভবিষ্যৎ সরকারপ্রধানের নিরাপত্তা বিবেচনায় এনে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন বাসভবনের জন্য বিকল্প জায়গা খোঁজার কাজও চলছে।
জানা যায়, ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাসভবন নির্ধারণে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন। এতে স্থাপত্য অধিদপ্তর, সংসদ সচিবালয় ও এসএসএফের শীর্ষ কর্মকর্তারাও যুক্ত আছেন।
কমিটির সদস্যরা এ বিষয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেন। শুরুতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল—সংসদ এলাকায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন একীভূত করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন করা হবে। গত সেপ্টেম্বরে ভবন দুটি তারা পরিদর্শনও করেন।
সূত্র জানায়, দুটি বাসভবন একীভূত করে ব্যবহারের জন্য কত খরচ পড়তে পারে, তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। সদস্যদের মতে, বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় সংস্কারে বেশি অর্থ লাগবে না—মূলত দুটি ভবনের মধ্যে সংযোগ স্থাপন ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজই বেশি গুরুত্ব পাবে। এসব কাজ শেষ করতেও খুব বেশি সময় লাগবে না বলে তারা ধারণা দেন।
আলাদা দুটি ভবনের মধ্যে সহজ যাতায়াতের জন্য একটি দুই স্তরবিশিষ্ট করিডোর নির্মাণ, একই সঙ্গে এ-১ ও এ-২ বাসা দুটিও পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কার্যালয় হিসাবে ব্যবহার করারও পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নিরাপত্তাসহ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তারা জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্মাণের উদ্যোগ থেকে শেষ পর্যন্ত সরে আসে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাড়ি দুটিকে একীভূত করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের জন্য নির্ধারণ করা হলে নতুন সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার কোথায় থাকবেন, তা নিয়েও ভাবতে হবে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের জন্য নতুন বাসভবন খুঁজতে হবে।
এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত বাড়িতে তিনি থাকলেই শুধু হবে না, তার দপ্তরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নিরাপত্তায় নিয়োজিতরা কোথায় থাকবেন, সে প্রশ্নও ওঠে। তাদের জন্যও নতুন করে বাড়ি বানাতে হবে। সংসদ ভবন এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর জন্য বাসভবন ও তার দপ্তরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নিরাপত্তায় নিয়োজিতদের জন্য বাড়ি তৈরি করা হলে বিখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশার লঙ্ঘন হবে।
এ প্রসঙ্গে সংসদ সচিবালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের মতো সংবেদনশীল স্থাপনার জন্য ঢাকা শহরে জুতসই স্থান পাওয়া খুবই মুশকিল। কারণ এক্ষেত্রে একই সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। তাই খুব ভেবে ও যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংসদ ভবন এলাকা নিরাপত্তার জন্য কোনোভাবেই জুতসই হবে না। এখন সংসদ অধিবেশন নেই। কিন্তু নির্বাচিত সরকারের সময় দুই মাস পরপর অধিবেশন বসবে।
সংসদ অধিবেশনের সময় সংসদ-সদস্যরা ছাড়াও তাদের নির্বাচনি এলাকার লোকজন আসেন। তাদের পরিবার, আত্মীয়স্বজনরাও এখানে থাকেন। সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকেন। তাই সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের জন্য এই জায়গা বেছে নেওয়া ঠিক হবে না-এটা কমিটির সদস্যরাও উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এরকম একাধিক প্রস্তাব আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়নের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী যুগান্তরকে জানান, একাধিক বিকল্প নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, আগামী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন কোথায় হবে, সেটি ঠিক করবে আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে আসা নতুন সরকার। বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা দেখভাল করছেন। তারাও এ বিষয়ে একমত হয়েছেন।