আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে এবং ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় ফুটবল স্টেডিয়াম সংলগ্ন রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানানো হয়। সামরিক অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন এবং বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
এর আগে জাতীয় ফুটবল স্টেডিয়ামে ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম পরিদর্শন ও অসামরিক প্রশাসনের সাথে মতবিনিময় করেন সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান।
সেনাবাহিনী প্রধান জাতীয় স্টেডিয়ামের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সভায় ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সামরিক, ঢাকা মহানগর, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময়কালে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়। সেনাপ্রধান পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নাগরিকবান্ধব আচরণের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, এই ব্রিফিংয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি, মোতায়েন এবং চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে গণমাধ্যমকে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া।
তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লিড মিনিস্ট্রি হিসেবে নির্বাচন উপলক্ষে পরিপত্র জারি করেছে, যেখানে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব ও ভূমিকা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনের পূর্বপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গত ১০ জানুয়ারি মোতায়েন সংখ্যা ৩৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজারে উন্নীত করে এবং পরবর্তীতে ২০ জানুয়ারি থেকে ১ লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
সেনাবাহিনীর এই কর্মকর্তা আরো বলেন, সারাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬২টি জেলা ও ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন এলাকাসমূহে মোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যাম্প থেকে নিয়মিত টহল, যৌথ অভিযান, চেকপোস্ট স্থাপন ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিজিবি, পুলিশ, র্যাব ও আনসারের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েনের ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।
তিনি বলেন, অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২০ জানুয়ারি থেকে মাত্র ১৪ দিনে প্রায় দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যার অধিকাংশই দেশি ও বিদেশি পিস্তল। এছাড়া নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ, ককটেল বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হচ্ছে। গত ৩১ জানুয়ারি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায় পরিচালিত এক বিশেষ যৌথ অভিযানে চারটি বিদেশি পিস্তল ও ১০টি গ্রেনেড সদৃশ হাতবোমা উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরো জানান, এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোট ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র ও ২ লাখ ৯১ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে এবং ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সেনাবাহিনীর প্রধান নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। এ মতবিনিময়ের মাধ্যমে দু’টি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আশ্বস্ত করা যে, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে যেকোনো প্রয়োজনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। দ্বিতীয়ত, সাধারণ জনগণের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আস্থা সৃষ্টি করা এবং একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া যে— সরকার, নির্বাচন কমিশন, অসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী সমন্বিতভাবে একটি অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে বদ্ধপরিকর।
তিনি জানান, নির্বাচনের দিন ও পরবর্তী সময়ে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য সামরিক হেলিকপ্টার ও জলযান প্রস্তুত থাকবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারগুলো সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে আগাম মোতায়েন থাকবে।
এবারের নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুরক্ষা অ্যাপ, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পুলিশের বডি ওর্ন ক্যামেরা, ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হবে, যাতে দ্রুত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের সমন্বয় সেলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় রাখা হচ্ছে। এছাড়া সেনাসদরে সার্বক্ষণিক একটি মনিটরিং সেল স্থাপন করা হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচারকে এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় হুমকি উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি, ভোট বর্জনে উসকানি, প্রার্থী বা প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হতে পারে। এ ধরনের অপতথ্য প্রতিরোধে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। সময়োপযোগী, বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করলে অপপ্রচার সহজেই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনী প্রধানের দিকনির্দেশনায় নির্বাচন কমিশন, অন্তর্র্বর্তী সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বাত্মকভাবে নিয়োজিত থাকবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মোতায়েন সম্পূর্ণভাবে সরকারের সিদ্ধান্ত এবং কবে সেনাবাহিনী দায়িত্ব শেষ করে ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যাবে সেটিও সরকারের নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল। সরকার যতদিন দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেবে, ততদিন সেনাবাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে থাকবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে যেকোনো ধরনের সহিংসতা, নাশকতা বা মব পরিস্থিতি প্রতিরোধে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, সে লক্ষ্যে নিয়মিত ও জোরদার টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। এবার সারাদেশে ৫৪৪টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টহল পরিচালিত হচ্ছে। মোট টহলের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজারে পৌঁছেছে বলে জানানো হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ভোটারদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকাকে সেনসিটিভ হিসেবে বিবেচনা করে সেসব অঞ্চলে বিশেষ থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন পূর্ব ও পরবর্তী সময়ের সম্ভাব্য পরিস্থিতি মাথায় রেখে সেনাবাহিনী নিজস্ব থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন করেছে এবং সেই অনুযায়ী মোতায়েন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার আশঙ্কা মোকাবিলায়ও সেনাবাহিনী প্রস্তুত থাকবে বলে জানানো হয়।
তিনি জানান, এবার নির্বাচনে প্রায় ১ লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, যেখানে আগের নির্বাচনগুলোতে ৪০ থেকে ৪২ হাজার সেনা সদস্য মোতায়েন ছিল। ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত সেনাবাহিনীর দায়িত্ব বৃদ্ধি এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই বাড়তি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জানানো হয়, ২০ জানুয়ারির পর সেনা মোতায়েন বাড়ানোর পর সহিংসতার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
হারিয়ে যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলমান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায়ও ১৫টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।