বিদেশে পালিয়ে থাকা ব্যক্তিদের দেওয়া হুমকির কোনো মূল্য নেই জানিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, সাহস থাকলে তারা দেশে আসুক। আইনের আশ্রয় নিক।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাইতুল ইজ্জতে অবস্থিত বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড কলেজের (বিজিটিসিএন্ডসি) প্যারেড গ্রাউন্ডে বিজিবির ১০৪ তম রিক্রুটিং প্যারেড সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার পুত্র জয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় হুমকি দিয়ে আসছেনÑএতে ভোটারদের কীভাবে আশ্বস্ত করবেন ? জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, যারা পালিয়ে আছে তারা অনেক কিছুই বলতে পারে। যদি সাহস থাকে দেশে এসে কথা বলুক। আইনের আওতায় এসে বললে সেটার অর্থ থাকবে। নির্বাচনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্বাচনে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য ফোর্সের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। কেউ বিশৃঙ্খলা করতে পারবে না। সবাই সহযোগিতা করলে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই হবে।

আরাকান আর্মির সীমান্ত আইন লঙ্ঘন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, মিয়ানমার একটি বৈধ রাষ্ট্র। কিন্তু বর্তমানে রাখাইন সীমান্ত এলাকায় আরাকান আর্মির দখল রয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী সেখানে নেই, এ কারণেই আমাদের সমস্যা হচ্ছে। তিনি জানান, বাংলাদেশের যোগাযোগ মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে রয়েছে এবং সীমান্তে কোনো ঘটনা ঘটলে মিয়ানমার সরকারকে প্রতিবাদ জানানো হয়। তবে আরাকান আর্মিকে এখনো বৈধতা দেওয়া হয়নি। তারা বিভিন্নভাবে সীমান্তে সমস্যা সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি একটি শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, মাঝে মাঝে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ হলে সেখান থেকে গোলা এসে বাংলাদেশের ভেতরে পড়ে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

সীমান্ত সিল করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি নাÑএমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সীমান্তে সবসময়ই বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। পালিয়ে থাকা সাবেক সরকারের অনুসারীরা বাহিনীর ভেতরে আছে কি নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন, পালিয়ে থাকাদের কোনো অনুসারী আমাদের বাহিনীর মধ্যে নেই।

সদ্য শেষ হওয়া বিজিবির রেকর্ড ৩ হাজার ২৩ জন সৈনিক রিক্রুটিং প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এই প্যারেড গ্রাউন্ডে গত ৪৪ বছর ধরে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সাধারণত এখানে ৮০০ থেকে ১ হাজার রিক্রুট প্রশিক্ষণ শেষে পাস আউট করত। তবে এবার প্রথমবারের মতো ৩ হাজারের বেশি নবীন সৈনিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে। তাদের দ্রুত প্রশিক্ষণ শেষ করে বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, এত বেশি রিক্রুটমেন্টের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে এসব বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।

তিনি বলেন, ‘সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে বিজিবি দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কি.মি. দীর্ঘ সীমান্ত সুরক্ষার মাধ্যমে দেশমাতৃকার অখ-তা রক্ষা ও সীমান্তের নিরাপত্তা বিধানে কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। এছাড়াও চোরাচালান রোধ, মাদক ও মানবপাচার রোধসহ যে কোনো আন্ত:সীমান্ত অপরাধ দমন, দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা প্রদান এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় বিজিবি অত্যন্ত দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করে দেশবাসীর আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নবীন সৈনিকদের উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘শৃঙ্খলা হচ্ছে সৈনিক জীবনের অলংকার । আদেশ ও কর্তব্য পালনে যে কখনো পিছপা হয় না সেই প্রকৃত সৈনিক।’ তিনি বিজিবি’র চারটি মূলনীতি ‘মনোবল, ভ্রাতৃত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও দক্ষতা’-এ উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়ে বিজিবি’র ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুশৃঙ্খল ও সুচারুরূপে পালন করে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখ-তা রক্ষার সুমহান দায়িত্ব পালনে সদা জাগ্রত থাকতে নবীন সৈনিকদের আহ্বান জানান। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রায় ৮.১৭ লক্ষ নিরাপত্তা কর্মী নিয়োজিত থাকবেন।

নির্বাচনে বিজিবিকে নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, আপনাদের যে কোন ধরনের অনৈতিক পক্ষপাতমূলক বা দায়িত্ব বহির্ভূত আচরণ ও কর্মকা-, যা নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রভাবিত করতে পারে; তা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকার জন্য আমি আপনাদেরকে সুপষ্টভাবে নির্দেশনা প্রদান করছি।

আমি বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলতে চাইÑদুর্নীতি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু। দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে এবং জনগণের বিশ্বাস ভেঙে দেয়। কোনো বিজিবি সদস্য যদি ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ বা রাজনৈতিক সুবিধার অংশ হয়ে কাজ করে, তবে সে শুধু আইন ভাঙ্গে নাÑসে রাষ্ট্রের ভিত্তিকেও দুর্বল করে। বিজিবি সদস্যরা কোনো রাজনৈতিক দলের বাহিনী নয়, কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর রক্ষক নয়Ñএটি রাষ্ট্রের নিরীহ জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারী।

লিখিত বক্তব্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আপনাদের কেউ যেন কখনো কোনো বেআইনি আদেশ, কোনো স্বার্থান্বেষী এজেন্ডা বা কোনো পক্ষপাতমূলক কর্মকা-ের অংশ না হন। সাহস মানে শুধু বিপদের মুখে দাঁড়ানো নয়; সাহস মানে অন্যায় আদেশকে না বলা, অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেওয়া, জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, মজলুমের পক্ষে কাজ করা, দায়িত্ব পালনে ন্যায়ানুগ পন্থা অবলম্বন করা এবং নিজেকে সঠিক পথে অটল রাখা। সততা, নৈতিকতা ও বিবেকই হবে আপনাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, কমান্ডেন্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গাজী নাহিদুজ্জামান, ডেপুটি কমান্ডেন্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল জাহিদসহ কর্মকর্তাসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সামরিক ও বেসামরিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ ও স্থানীয় প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ##