আগামী নির্বাচন সকলের জন্য একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব উল্লেখ করে এই দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে ভূমিকা রাখতে জেলা পুলিশ সুপারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে নতুন দায়িত্ব প্রাপ্ত ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় এই আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এবারের নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা শহিদ হয়েছে, তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই নির্বাচন। তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে আমরা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবো।
তিনি আরো বলেন, আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের সময় একই সাথে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে, যা আগামীর বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। গণভোটের মধ্য দিয়ে আমরা যে নতুন ভিত্তি পাবো সেটা শতবর্ষ ধরে এই জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সামনের নির্বাচনে বিদেশ থেকে অনেক প্রতিনিধিদল, নির্বাচন পর্যবেক্ষক আসবেন। তারা যেন এই নির্বাচনকে একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত হিসেবে সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারেন, সেই লক্ষ্যে পুলিশ সুপারদের কাজ করে যেতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অতীতের নির্বাচনগুলো আমরা সবাই দেখেছি। কেউ প্রহসনের নির্বাচন বলে, কেউ বলে প্রতারণা আর তামাশার নির্বাচন। সেখান থেকে বেরিয়ে অনেক উপরে উঠে আমাদের একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে হবে। সেই পরিবর্তন নিয়ে আসাই পুলিশ বাহিনীর বড় দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা।
আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সুন্দর করার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের উদ্যোগী ও সৃজনশীল হওয়ার উপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সব কথা তো কাগজে লিখে দেওয়া যায় না। দায়িত্ব পালনের সময় আপনারা চিন্তা করবেন, কীভাবে কাজটি আরো সুন্দরভাবে করা যায়।
পুলিশ সদস্যদের কাজের মান উন্নত করতে ও কাজে আনন্দ বাড়াতে জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে সদস্যদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ক্ষেত্রে পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা করা যায় বলেও তিনি পরামর্শ দেন।
মতবিনিময় সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মোঃ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মোঃ খোদা বকস চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি এবং বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত :
দেশের বন, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ পাস করা হয়েছে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে তাঁর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এবং ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুমোদন দেওয়া হয়। বন সংরক্ষণে প্রায় ১০০ বছর ধরে কার্যকর দি ফরেস্ট এক্ট, ১৯২৭ বর্তমান পরিবেশগত বাস্তবতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আর পর্যাপ্ত নয়।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণের চাপ, অবৈধ দখল, বনভূমি উচ্ছেদসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশে প্রাকৃতিক বন রক্ষা, বনভূমির রেকর্ড ও সীমানা সংরক্ষণ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ দখল প্রতিরোধ, অবক্ষয়িত বন পুনরুদ্ধার, আগ্রাসী প্রজাতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্তনযোগ্য ও কর্তন নিষিদ্ধ বৃক্ষের তালিকা হালনাগাদের মতো বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২’ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার পরিবর্তনের কারণে নতুন ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণীত হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ, শিকার, পাচার, হত্যা ও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় করা হয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা, বন্যপ্রাণী উদ্ধার, শুশ্রƒষা, পুনর্বাসন, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানুষ-বন্যপ্রাণীর সুসমন্বিত সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সংরক্ষণ কার্যক্রমে বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন, পাস হওয়া এই দুটি নতুন অধ্যাদেশ বনসম্পদ, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দেশের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে পরিবেশগত নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ প্রকৃতি সংরক্ষণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।